বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের খেলোয়াড় এবং লিওনেল মেসির জার্সিতে থাকা বিখ্যাত প্রতীক বা ক্রেস্টটি খুব ভালোভাবেই চেনেন। এটি একটি উল্লম্ব ঢাল (শিল্ড) আকৃতির প্রতীক। নিচে রয়েছে বিজয় ও গৌরবের প্রতীক লরেল পাতার দুটি শাখা, আর ওপরে রয়েছে তিনটি তারা—যা আর্জেন্টিনার তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মারক।
তবে খুব কম মানুষই জানেন, এই ক্রেস্টের ইতিহাস জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার একটি ইহুদি ক্রীড়া ক্লাবের সঙ্গে। এই ক্লাবেই এর নকশাকার ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসা গড়ে তুলেছিলেন। নরবের্তো ‘টোটো’ রুডের বয়স তখন কুড়ির শেষ দিকে। তিনি ইহুদি ক্রীড়া ক্লাব ক্লাব নাউতিকো হাকোয়াহের (উচ্চারণ হাকোয়াখ) সদস্য ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জন্য এই ক্রেস্টের নকশা প্রস্তাব করেন। বুয়েনস আইরেসে ব্যবসায়ী, ফুটবলপ্রেমী এবং গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে যে অভিজ্ঞতা ও ব্র্যান্ডিং দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন, সেগুলো কাজে লাগিয়েই তিনি এই নকশা তৈরি করেন।
দীর্ঘদিন ধরেই টোটো রুডকে এই ক্রেস্টের স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন—ইউরোপের অনেক ফুটবল দলের নিজস্ব আলাদা প্রতীক থাকলেও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে চেনার একমাত্র উপায় ছিল তাদের আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সি।
সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগে আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখতে গিয়ে তিনি দেখেন—পশ্চিম জার্মানিকে তাদের ঈগল প্রতীক দেখে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘সিসিসিপি’ লেখা দেখে দর্শকেরা সহজেই চিনে ফেলতে পারেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সির মতো একই ধরনের ডোরাকাটা জার্সি অন্য ক্লাবগুলোরও ছিল। তাই অনেক সময় আর্জেন্টিনাকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে যেত। তখন তাঁর মনে হয়, দেশের সমৃদ্ধ ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গে মানানসই একটি স্বতন্ত্র প্রতীক জাতীয় দলেরও থাকা উচিত।
তিনি প্রায় ২০টি আলাদা নকশা তৈরি করে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে জমা দেন। সেই প্রস্তাব সংস্থার সভাপতি ও নির্বাহী কমিটির কাছেও পৌঁছে যায়। অনুমোদনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৯৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর বুয়েনস আইরেসে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ০-০ গোলে ড্র হওয়া একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথমবারের মতো এই ক্রেস্ট ব্যবহার করা হয়।
প্রায় ৫০ বছর পরও এই ক্রেস্টে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আজ এটি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফুটবল দলীয় প্রতীকগুলোর একটি। কারণ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জার্সি পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই জনপ্রিয়।
টোটো রুডের ছেলে অলিভার রুড জিউইশ টেলিগ্রাফিক এজেন্সিকে বলেন, ‘ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন সদস্যের ছেলে হিসেবে এবং একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবার আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ক্রেস্টটি দেখি, এখনও আমি বিস্মিত হয়ে যাই।’
টোটো রুড তাঁর তৈরি করা ক্রেস্ট পরে আর্জেন্টিনাকে ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জিততে দেখেছিলেন। তবে ২০২২ সালে দলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় তিনি দেখে যেতে পারেননি। ২০১০ সালে ৬১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে বুয়েনস আইরেসের লা তাবলাদা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়, যা লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইহুদি কবরস্থান।
অলিভার রুড জানান, তাঁর দাদী ইউক্রেন থেকে আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অনেক ইহুদি অভিবাসী একই পথ ধরে আর্জেন্টিনায় বসতি গড়েছিলেন। টোটো রুড ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন হাকোয়াহ ক্লাবের সদস্য ছিলেন এবং নিজেও সেখানে ক্লাব ফুটবল খেলতেন। ১৯৩৫ সালে বুয়েনস আইরেসে ইহুদি অভিবাসীরা ক্লাব নাউতিকো হাকোয়াহ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্লাব। বর্তমানে এর প্রায় ১০ হাজার সদস্য রয়েছে। ক্লাবটির মোট পাঁচটি কেন্দ্র রয়েছে। এর একটি বুয়েনস আইরেস শহরে এবং বাকি চারটি বুয়েনস আইরেস প্রদেশের উত্তরের শহর তিগ্রেতে অবস্থিত।
হিব্রু ভাষায় ‘হাকোয়াহ’ শব্দের অর্থ ‘শক্তি।’ এই ক্লাব থেকেই অনেক বিখ্যাত ইহুদি ক্রীড়াবিদের উত্থান হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম টেনিস তারকা দিয়েগো শোয়ার্টজম্যান। অলিভার রুড জানান, হাকোয়াহর বিশাল ক্যাম্পাসে তাঁর বাবার স্মরণে একটি গাছ লাগানো হয়েছে।
হাকোয়াহ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ওসভালদো অফমান তিনি বলেন, ‘হাকোয়াহ ক্লাবের একজন সদস্যই যে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) প্রতীকচিহ্নটি তৈরি করেছিলেন, এটি আমাদের জন্য অনেক গর্বের বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘তাঁর তৈরি করা এই নকশা শুধু বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সির প্রতীক নয়, এটি আমাদের এই অনুভূতিও দেয় যে হাকোয়াহ ক্লাব এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি ছোট অংশ আজও বিশ্বের পরিচিত একটি প্রতীকচিহ্নের মাধ্যমে বেঁচে আছে।’
মঙ্গলবার বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-তে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় মিসর। এর আগে শুক্রবার অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারানোর পর মিসরের কোচ হোসাম হাসান মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে হাঁটেন। সেই সময় গ্যালারি থেকে ‘ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান শোনা যায়। ঘটনাটির ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাচ শেষে হাসান বলেন, তাঁর ‘হৃদয় ও আত্মা’ ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে রয়েছে। তিনি এই জয় মিসর এবং ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি উৎসর্গ করেন।
এই ম্যাচটি এমন এক বিশ্বকাপে এক ধরনের প্রতীকী ইসরায়েল-ফিলিস্তিন লড়াইয়ের রূপ নেয়, যেখানে ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনের কোনো দলই খেলছে না। কারণ, একদিকে মিসর প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সরকার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী লিওনেল মেসিও অতীতে ইসরায়েল সফর করেছেন। এ ছাড়া, ইসরায়েলের একটি সাময়িকীর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বকাপে ইসরায়েলি দর্শকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল আর্জেন্টিনা। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা চান আর্জেন্টিনাই বিশ্বকাপ জিতুক।
মিসর আর্জেন্টিনা নকআউট ম্যাচটি এমন একটি ঘটনারও ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়, যা একসময় মিসরে বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল। তখন মেসি একটি মিসরীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি কায়রোর একটি দাতব্য সংস্থাকে তাঁর জুতা দান করবেন। এরপর অনুষ্ঠানের উপস্থাপকরা অভিযোগ করেন, মেসি ইহুদি এবং তিনি ইসরায়েলের পক্ষের মানুষ। কারণ, এর তিন বছর আগে তিনি ইসরায়েল সফর করেছিলেন।
সেই সময় মিসরীয় ফুটবল ফেডারেশনের মুখপাত্র আজমি মোগাহেদ ফোনে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জানি তিনি ইহুদিদের পক্ষের লোক। তিনি ইসরায়েলকে অনুদান দিয়েছেন, ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা পশ্চিম দেওয়াল (ওয়েইলিং ওয়াল) পরিদর্শন করেছেন এবং আরও অনেক কিছু করেছেন। আমাদের তাঁর জুতার দরকার নেই। মিসরের গরিব মানুষেরও এমন কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই, যার ইহুদি বা জায়নবাদী নাগরিকত্ব রয়েছে।’ আজমি মোগাহেদ ২০২০ সালে মারা যান।
বর্তমানে মেসি নিয়মিত মৌসুমে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলেন। তাঁর বয়স এখন ৩৯ বছর। অনেকের ধারণা, এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। তাই মিসরের কাছে আর্জেন্টিনা হেরে গেলে সেটিই হতো আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর শেষ ম্যাচ। কিন্তু ম্যাচে মিসর ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর মেসি একটি গোল করান এবং একটি গোল করেন। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে এসে শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়।
অলিভার রুডের কাছে এই ম্যাচটি শুধু মেসির অবদান মনে করার নয়, তাঁর নিজের বাবার অবদানও স্মরণ করার একটি উপলক্ষ ছিল। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতীকচিহ্নটি যখনই দেখি, এখনও অবাক হয়ে যাই। সেদিনও আমি আর আমার ভাই গুইদো এ নিয়ে কথা বলছিলাম। ভাবতেই অবিশ্বাস্য লাগে, প্রায় ৫০ বছর আগে টোটোই জাতীয় দলের এই প্রতীকচিহ্নটি তৈরি করেছিলেন। সত্যিই এটি অসাধারণ। প্রতিবার এই প্রতীকচিহ্নটি দেখলে মনে হয়, তাঁর একটি ছোট অংশ এখনও আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে। তাঁকে স্মরণ করার এটি খুব সুন্দর একটি উপায়।’
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল








