মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজাতির কল্যাণ সাধন করা, তাদের সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো। আর আল্লাহকে বিশ্বাস করো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)
এই দুনিয়া হলো কর্মের জায়গা, আর কর্ম সেটাই, যেটা উত্তম। সুতরাং আমাদের আগে জানতে হবে, ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম কাজ কোনটা। অল্প কথায় বলতে গেলে, আমরা যে যেই কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি, সেখান থেকেই আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী চলা এবং নিষেধগুলো বর্জন করাই ভালো কাজ।
আমরা যদি আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারি, তবে আমরা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষ কি মনে করে, তাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে?’ (সুরা কিয়ামা, আয়াত : ৩৬) আবার সুরা মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াতে মহান স্রষ্টা একথাই ব্যক্ত করেছেন, ‘তোমরা কি ভেবেছ, তোমাদের অহেতুক সৃষ্টি করেছি?’
মূলত বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্যই তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আমরা আজ আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে বসেছি। তাই তো সমাজ, দেশ ও বিশ্বের সর্বত্র অশান্তি বিরাজমান।
একের পর এক অন্যায় আমার দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। ক্ষণিকের জন্যও আমি আমার প্রভুকে স্মরণ করি না, তাঁকে ভয় করি না। অথচ তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমাদের অপকর্ম দেখা সত্ত্বেও আমাদের ছাড় দিচ্ছেন, সংশোধনের সময় দিচ্ছেন। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যেখানেই তোমরা যাও, তিনি তোমাদের সঙ্গে থাকেন। আর তোমরা যা-ই কর, আল্লাহ তা পুরোপুরি দেখেন।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ৪)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক এটাও ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি আমাদের জীবনশিরা অপেক্ষাও নিকটে রয়েছেন।’ (সুরা কাফ, আয়াত : ১৬) আল্লাহপাক আমাদের এত নিকটে, তারপরও আমরা তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত থেকে যাই। এর কারণ কী? এর মূল কারণ হলো, আমার যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং তিনি যে আমার সবকিছু দেখছেন, এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কখনো চিন্তা করি না। যার কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বারা নানা মন্দ কাজ সংঘটিত হচ্ছে।
হাদিসে বলা হয়েছে, মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার নিজ সত্তার পরিচিতি লাভ করতে পেরেছে, সে মহান প্রভুকে চিনতে পেরেছে।’
উল্লিখিত হাদিসের কথাই পবিত্র কুরআনের সুরা হাশরের ১৯ নম্বর আয়াতে ভিন্ন ভঙ্গিতে মহান আল্লাহপাক ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদের আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন।’ এ কথার অর্থ হলো, আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মানে নিজ সত্তাকে ভুলে যাওয়া। আসলে কি মানুষ নিজ সত্তাকে ভুলে যায়? হ্যাঁ, মানুষ নিজ সত্তাকে ভুলে যায়।
আমরা লক্ষ্য করে দেখি, অধিকাংশ মানুষের উদ্দেশ্যই দুনিয়াবি। তবে একজন প্রকৃত মুমিন-মুসলমানের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে মহান মালিক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে অনন্ত পরকালে জান্নাত লাভ করা। আমরা যদি এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সততার সঙ্গে এগিয়ে চলি, তাহলে দেখা যাবে, দ্বীন ও দুনিয়া—দুটিই লাভ করা সম্ভব।
আজ আমরা নিজ সত্তাকে ভুলে বসেছি। যেহেতু আজ আমরা নিজ সত্তাকে ভুলে বসেছি, তাই আজ আমার দ্বারা কেউ আর নিরাপদ নয়। নিরীহ ও নিষ্পাপ শিশুদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করতে আমার হৃদয় আজ কাঁদে না। অহংকার আর ক্ষমতার দাপটে আমি আমার জন্মের উদ্দেশ্যকে ভুলে বসেছি।
অথচ আমরা দেখতে পাই, ইবলিসের সমস্ত আমল নষ্ট হয়েছিল কেবল তার অহংকার আর আমিত্বের কারণেই। সে নিজের সৃষ্টির উপাদানকে শ্রেষ্ঠ মনে করে আদমের সৃষ্টিগত উপাদান (মাটি)-কে তুচ্ছজ্ঞান করে প্রভুর নির্দেশের অবাধ্য হয়। ফলে তার অর্জিত সব আমল বিনষ্ট হয়ে যায় এবং সে প্রভুর অভিশাপে পতিত হয়। তাই মানুষ যাতে কখনো অহংকারী না হয় এবং আমিত্ব তাকে গ্রাস না করে, সে জন্যই মহান প্রতিপালক তাকে তার সৃষ্টিগত উপাদানের কথা পবিত্র কুরআনে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আজ যারা ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তির গর্ব করে আল্লাহপাকের সৃষ্টিকে কষ্ট দেয়, তাদের অবস্থা যে ইবলিসের ন্যায় হবে না, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? আজ আমরা সৃষ্টিকর্তা খোদাকে ভুলে গিয়ে হৃদয়ে শত শত মিথ্যা খোদার স্থান দিয়েছি। মুখে এক আর অন্তরে ভিন্ন—এটাই যেন আজ রীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের অন্তরে কী আছে, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
মানুষকে নানাভাবে ধোঁকা দেওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ তিনি প্রকাশ্য ও গোপন, ভেতর ও বাহিরের সবকিছু সম্পর্কেই অবগত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি বল, তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমরা গোপন কর বা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর আকাশসমূহে যা আছে এবং পৃথিবীতে যা আছে, তিনি তাও জানেন। আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে সর্বশক্তিমান। সেদিন প্রত্যেকেই যে ভালো কাজ করেছে, তা চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যে মন্দ কাজ করেছে, তাও দেখতে পাবে। তখন তারা কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান থাকত! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অতি মমতাশীল।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৯-৩০)
এখন সময় এসেছে নিজেকে চেনার ও জানার, নিজেকে সংশোধন করার। অনেকে বলতে পারেন, কেবল নিজেকে চিনলে লাভ কী? হ্যাঁ, লাভ আছে। যেভাবে বিন্দু বিন্দু জল মিলে নদী হয়, ছোট ছোট পাথর মিলে পাহাড় হয়, লতাপাতা ও ছোট ছোট গাছ মিলে জঙ্গল হয়, ঠিক তেমনি একেকজন ব্যক্তি মিলে একটি জাতি গঠিত হয়। কোনো জাতির গঠন, উন্নতি, শ্রেষ্ঠত্ব ও দৃঢ়তা অর্জনে সেই জাতির ব্যক্তিরাই মেরুদণ্ডের হাড়ের ভূমিকা পালন করেন।
এই সত্য অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই যে, কোনো জাতির উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সেই জাতির লোকেরাই চাবিকাঠির ভূমিকা পালন করে। আবার কোনো জাতির অধঃপতনের চরমে নিপতিত হওয়ার ক্ষেত্রেও তারাই দায়ী। তাই নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবতে হবে এবং নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে।
আমরা লক্ষ্য করে দেখি, অধিকাংশ মানুষের উদ্দেশ্যই দুনিয়াবি। তবে একজন প্রকৃত মুমিন-মুসলমানের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে মহান মালিক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে অনন্ত পরকালে জান্নাত লাভ করা। আমরা যদি এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সততার সঙ্গে এগিয়ে চলি, তাহলে দেখা যাবে, দ্বীন ও দুনিয়া—দুটিই লাভ করা সম্ভব।
আমাদের জীবন-মরণ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত। অর্থহীন কাজে আনন্দ-ফুর্তি করে সময় নষ্ট না করে সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে স্মরণ করে জীবন পরিচালনা করলে আল্লাহপাক অবশ্যই সফলতা দান করবেন।
সত্যিকার অর্থে প্রত্যেক মুমিন-মুসলিমের প্রত্যেকটি কার্যকলাপ ও ধ্যান-ধারণা হওয়া উচিত চিরস্থায়ী জীবনকে সামনে রেখে। আল্লাহপাক আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমরা যেন আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হই।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/জেআইএম








