২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল এবং এরপর তা যে খাতে প্রবাহিত হয়েছিল, তা নিয়ে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলবে। চব্বিশ সালের মাঝামাঝি সময় যে ঘটনাবলিকে বিপ্লব না গণ-অভ্যুত্থান বলা হবে, তা নিয়ে ভাবছিল মানুষ, তারাই এই ২০২৬ সালে এসে ওই ঘটনার নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেই ব্যাখ্যাগুলোর বেশির ভাগই জুলাইয়ের ঘটনাবলিকে মহিমান্বিত করে না। বিশেষ করে যখন থেকে পরিষ্কার হতে থাকে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতার ইন্ধন ছিল তাতে, তখন থেকেই একটি স্বপ্ন মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। ধুঁকে ধুঁকে সেই স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে।
যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে একটি ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেছিলেন আন্দোলনের নেতারা, তাঁরা পরবর্তীকালে আদতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন কি না, তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেই প্রশ্নগুলো কি আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক নয়? তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়? ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। প্রত্যেককেই তার করা অন্যায়ের জন্য কোনো না কোনো সময় জবাবদিহি করতে হয়। এর কিছু অংশের ফয়সালা হয় নির্বাচনের মাঠে, কিছু অংশের ফয়সালা হয় জনগণের মনস্তাত্ত্বিক বাঁক পরিবর্তনে। ইতিহাসের কোনো এক সময়ে সেই ফয়সালাগুলো দেখার জন্যও রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই তালিকা থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, বিভিন্ন বাম দল বাদ যাবে না। কেউ এখন ফল ভোগ করছে, কেউ ভবিষ্যতে করবে। আফসোস হলো, কোনো দলই তার নিজের করা ভুলগুলো স্বীকার করে না, বরং তার সাফাই গায়। পতিত দলগুলো ক্ষমতায় ফিরে আসে অন্য দলগুলোর দিক থেকেও ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসে না বলে। কার চেয়ে কে কত খারাপভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারি, আমরা যেন সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছি।
বৈষম্যবিরোধী যে আন্দোলনটি পরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিল, সেই আন্দোলনের মুখ বলে যাঁরা পরিচিত হয়ে উঠেছেন, তাঁরাই কি আদৌ ঘটনাবলির মূল চরিত্র, নাকি পর্দার অন্তরালে আরও অনেকগুলো দেশি-বিদেশি মুখ রয়েছে, যাঁরা এখনো জনসমক্ষে আসেননি। এমনও হতে পারে, কখনোই জানা যাবে না, কাদের হাতে ছিল এই পরিবর্তনের চাবিকাঠি। পরিবর্তনটি এখন কোন দিকে রওনা দিয়েছে, সেটাইবা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা কি জানা যাবে?
আর একটি বিষয় এখন ঘুরেফিরেই বিভিন্ন আলোচনায় আসছে। যে আন্দোলনের স্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ধরনের স্লোগান, যে আন্দোলনের সময় বেজেছিল মুক্তিযুদ্ধ ও দেশাত্মবোধক গান, আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে তা কোন ডিজাইনে অদৃশ্য হয়ে গেল? বরং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই গণভবন লুটপাটের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো যে ক্রোধের সঙ্গে ভেঙে ফেলা শুরু হলো, সেটা যে আন্দোলনের লুক্কায়িত ‘ভাষা’ ছিল, সেটা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে। এরপর যখন মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে উল্লাস করল একশ্রেণির বর্বর, তখন পরিষ্কার হলো, দেশটার গতিপথ বদলে দেওয়ার সূক্ষ্ম কার্যাবলি শুরু হয়ে গেছে। তারপর মাজার ভাঙা, শিক্ষকদের অপমান, ‘দোসর’ নাম দিয়ে মানুষকে অপমান করার মাত্রা বাড়তে থাকলে বোঝা গেল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। সেটা কতটা ‘কালা’, সে প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আরও কিছুটা সময় দরকার।
মবের জয়জয়কার শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এই অন্তর্বর্তী সরকারই মবকে লালন-পালন করেছে। সুদূর ফরাসি দেশ থেকে সসম্মানে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ীকে নিয়ে এসে ক্ষমতার শিরোমণি করা হলো, তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝিয়ে দিলেন, দেশের গতিপথ কোন দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা তাঁর জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং নিজের ও নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে যে মামলাগুলো হয়েছিল, সেগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠলেন। বিচারকেরা তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা-বিষয়ে বিব্রত হতে থাকলেন। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় করার অনুমতি দেওয়া হলো। তাদের কর মওকুফ হয়ে গেল। তিনি নির্লজ্জভাবে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করলেন। অথচ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসমৃদ্ধ ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হলো, তা নিয়ে বলিষ্ঠ কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা গেল না। স্বাধীনতাবিরোধীদের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ দেখা যেতে শুরু করল তখন থেকেই। সাদা জমিনে কালো অক্ষরে লেখা পতাকা হাতে মিছিলগুলোর কথা কি মনে আছে কারও?
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হেডমাস্টার আর অধ্যক্ষের পদগুলো পরিবর্তন করে কাদের সেসব পদে বসানো হলো, সে কথা কি এখন কেউ মনে করতে পারছে? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দলীয়করণের যে অভিযোগ ছিল, সে অভিযোগগুলো এখন কাদের বিরুদ্ধে শোনো যাচ্ছে? সে অভিযোগ থেকে কি বিএনপি বা জামায়াত মুক্ত হতে পারবে? তাহলে পরিবর্তন বলতে কি কিছু হয়েছে? যেটা হয়েছে, সেটা হলো ক্ষমতায় থাকা বা না থাকা অন্যায়কারী হিসেবে দলের নামেরই পরিবর্তন হয়েছে শুধু। আগে একদল লোক মধু খেত, এখন তারা খেতে পায় না, এখন খায় অন্য দলের লোক। মধু খাওয়া তাতে থামছে না।
এই সরকারের আমলে নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সুপ্রিম কোর্টে বার কাউন্সিলের নির্বাচনের আদলে যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়, তাহলে তাতে কারা নির্বাচিত হবেন, তা নির্ধারিতই হয়ে থাকবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় লেবাসে হয় না। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি মিলে এমন কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যাতে তাদের বাইরের কেউ যেন নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারে। মব করে যে কাউকে যে কারও ‘দোসর’ নাম দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা যদি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চালু থাকে, তাহলে এই সরকার কিংবা চব্বিশের সুবিধা ভোগকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারেও আওয়ামী লীগের মতো ‘আমরা আর মামুরা’র নির্বাচনের অভিযোগ উঠবে। এ রকম বাজে ব্যাপার ঘটার আশঙ্কা আছে। নির্বাচনের মাঠটাকে দলীয় ক্যারিশমা প্রয়োগের জায়গা ভাবলে তা কারও জন্য স্বাস্থ্যকর হবে না। সেটাও হবে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা হাতিয়ে নেওয়ার অনুশীলন। সরকার যেন সেই ‘আমরা আর মামুরা’ নির্বাচনের পথে না হাঁটে, সেই পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ পরামর্শক কি বিএনপিতে নেই? আওয়ামী লীগে সে রকম পরামর্শক কেউ ছিল না, আওয়ামী লীগ তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করছে। একই ভুল বিভিন্ন দল করতে থাকলে, তারাও একই ফল ভোগ করবে না—এ রকম গ্যারান্টি কে দেবে?
এনসিপি নামের নতুন রাজনৈতিক দলটি নিয়ে এখনই শেষ কথা বলে দেওয়ার সময় আসেনি। কিন্তু দল গঠনের আগে ছাত্রদের দল নিয়ে যে আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল, তা যে সেভাবে টিকে নেই, সেটা খালি চোখেই দেখা যায়। এনসিপির মূল নেতৃত্বের একটি বড় অংশ জামায়াত বা শিবিরের রাজনীতির অনুগত, সেটা তাঁদের অনেকেই নিজেরা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ ছাত্রলীগে ‘গুপ্ত’ অবস্থায় ছিলেন। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসাধারণ বাক্যনিচয় রচনা করেছেন, বক্তৃতা করে অনেকের তারিফ পেয়েছেন, পরিবর্তনের পর তাঁরাই বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করেছেন। ছাত্রদের দলের প্রতি দেশের শিক্ষার্থীদের কতটা সমর্থন আছে, সেটা এই দলের সভা-সমাবেশ হলেই বোঝা যায়। জামায়াতের সঙ্গে এক হয়ে নির্বাচন করায় তাদের আদর্শিক জায়গাটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এরা মুক্তিযুদ্ধকে কী চোখে দেখে, তা নিয়ে সাধারণ জনগণের সংশয় কাটেনি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, এনসিপিতে যারা একবুক স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিল, কিন্তু জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে একাত্মতা মানতে পারেনি, তাদের অনেকেই দলটি থেকে বের হয়ে গেছে। তাসনিম জারা, তাসনূভা জাবিন এর উদাহরণ। অর্থাৎ এনসিপি এখন একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, সেটাও নজরে পড়ছে অনেকের।
ফলে যে স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে বলে দেশের আপামর জনগণ আশা করেছিল, সেই লক্ষ্য অধরাই রয়ে গেছে। যেকোনো পরিসংখ্যানই বলে দেবে, চব্বিশের চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে এতটাই ফারাক যে, সে স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে বলা হলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যায় ও অনাচারের শিকার হয়ে জনগণ বারবার আন্দোলন করে কিন্তু আন্দোলনের নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার পর আগের সরকারের মতোই রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে অভিনয় করতে থাকেন। একই নাটক, শুধু অভিনয়শিল্পীর পরিবর্তন হয়। এই ট্র্যাডিশনই চলছে।








