পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের গণ–অসুস্থতার ঘটনা নতুন নয়। গত মঙ্গল ও বুধবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ি এলাকার কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড পোশাক কারখানায় ১৪৭ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগে গত ২৪ জুন এই কারখানাতেই রাতের পালায় কর্মরত অবস্থায় এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একের পর এক শ্রমিকের এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা কেবল সংশ্লিষ্ট কারখানার উৎপাদনকেই ব্যাহত করছে না, বরং শ্রমিকদের মনে একধরনের গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই গণ-অসুস্থতার কারণ হিসেবে ‘শয়তানের আসর’ বা অলৌকিক কিছুকে দায়ী করার চেষ্টা চলছে। খোদ কারখানার কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, শ্রমিকদের একাংশের মধ্যে এ ধরনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে এবং এর সমাধানে কারখানায় মিলাদ পড়ানো হয়েছে। ধর্মীয় আচার বা প্রার্থনা মানুষের মানসিক শান্তির জন্য ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান না করে বিষয়টিকে স্রেফ ‘অলৌকিক’ তকমা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি হতে পারে ‘মাস হিস্টিরিয়া’ বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ। আবার কারখানার ভেতরের বাতাস, প্রচণ্ড গরম, ব্যবহৃত রাসায়নিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো পরিবেশগত বা শারীরিক কারণও এর পেছনে থাকা অসম্ভব নয়।
এর আগেও বিভিন্ন কারখানায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং ভীতি থেকে ‘মাস হিস্টিরিয়া’র নজির দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের প্রথম কাজ হওয়া উচিত শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভীতি দূর করতে বিজ্ঞানসম্মত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং কারখানার ভেতরের কাজের পরিবেশ ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা।
আমরা স্বাগত জানাই যে জেলা সিভিল সার্জনের পরামর্শে স্বাস্থ্য বিভাগ এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই তদন্ত যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে। কারখানায় কোনো বিষাক্ত গ্যাস বা কেমিক্যালের প্রভাব রয়েছে কি না, তা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। একই সঙ্গে কারখানার মালিকদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষাই কারখানার চাকা সচল রাখার মূল চাবিকাঠি। সে অনুসারে কারখানাগুলোকে স্বাস্থ্যোপযোগী করে তোলা হোক। গুজব বা অন্ধবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে এই সংকটের কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।








