জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
এই প্রথম কারো হাত ধরে পার্কে যাচ্ছে রবি। শ্রাবণ মাস। রিমঝিম বৃষ্টি। রিকশায় পাশাপাশি বসে দুজন। পলিথিনে ঢেকে রেখেছে পা। আকাশজুড়ে অভিমানী মেঘ। কিন্তু মেঘের চেয়েও ভারী যেন সাথীর মন। কেন যে সে এত চুপচাপ, রবি বুঝে উঠতে পারছে না। প্রায় চার বছরের সম্পর্ক। অথচ এই প্রথম মফস্বল ছেড়ে শহরে দুজনে একসঙ্গে ঘুরতে এসেছে। দিনটির জন্য কত অপেক্ষা ছিল রবির! কিন্তু সাথীর মুখের বিষণ্নতা তার সব আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।
রিকশা থেকে নেমে টিকিট কেটে তারা পার্কে ঢুকল। বৃষ্টির কারণে দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। যেন বিশাল পার্কজুড়ে শুধু তারা দুজন। একটি হরিতকী গাছের নিচে বসে চিপস খেতে খেতে রবি বলল, ‘সাথী, কফি নাকি চা?’
‘কফি হলে ভালো হয়।’
রবি দুজনের জন্য দুই কাপ গরম কফি নিয়ে এলো। সাথী কফিতে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে, আর পুকুরের জলে বৃষ্টির বৃত্তগুলো দেখছে। রবি আলতো করে তার হাতটা চেপে ধরে পাশে বসল।
‘আচ্ছা বলো তো, সেই কখন থেকে দেখছি তোমার মন খারাপ। কী হয়েছে?’
সাথী চুপ।
‘এই, বলবে তো?’
‘কই... কিছু না।’
‘তুমি না বললেও আমি তো তোমাকে বুঝি।’
হঠাৎ রবি সামনে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, ওই দুটি বানর! কী সুন্দর করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। কত ভালোবাসা!’ বলতে বলতে রবি সাথীর হাতটি তুলে কপালে আলতো করে চুমু দিতে গেল। ঠিক তখনই সাথী ধীর কণ্ঠে বলল, ‘রবি, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।’
‘কী কথা?’
‘বলতে ভয় লাগছে। তুমি খুব কষ্ট পাবে।’
‘কষ্ট হলেও বলো।’
সাথী কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল। তারপর ধীরে বলল, ‘আমাদের সম্পর্কটা আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’
রবি যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।
‘কী বলছ! মজা করছ, তাই না?’
‘না, রবি। আমি সিরিয়াস।’
‘কিন্তু কেন?’
‘আমার পরিবার কোনো দিন তোমাকে মেনে নেবে না।’
‘আমি যদি প্রতিষ্ঠিত হই? যদি নিজের যোগ্যতায় সবার সম্মান অর্জন করি?’
সাথী মাথা নাড়ল—‘তবুও না। তুমি যদি দেশের সবচেয়ে বড় মানুষও হও, তবুও না।’
রবির কণ্ঠ কেঁপে উঠল—‘কিন্তু কেন, সাথী?’
সাথীর চোখে তখন জল—‘আমার দুলাভাই স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি যদি তোমাকে বিয়ে করি, তাহলে তিনি আমার বোনকে ডিভোর্স দেবেন। আমি চাই না আমার ভালোবাসার জন্য আমার বোনের সংসার ভেঙে যাক।’
রবি নির্বাক হয়ে গেল। তার হাতে ধরা কফির কাপটি ঠান্ডা হয়ে এসেছে। চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর সে ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে... আমাদের ভালোবাসার কোনো পূর্ণতা নেই?’
সাথী কোনো উত্তর দিলো না। শুধু চোখ বেয়ে নেমে আসা অশ্রুবিন্দু বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে গেল। রবি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টিই যেন চার বছরের ভালোবাসার শেষ সাক্ষী।
সাথী মেসে চলে গেল। রবি সিএনজিতে উঠে বাড়িতে রওয়ানা হলো। সিএনজিতে বসে বসে তার মনে ভেসে উঠল সেই চার বছর আগে এক কার্তিকের সন্ধ্যা, যে সন্ধ্যায় প্রথমবার সাহস করে সে ভালোবাসার কথা লিখেছিল একটি চিঠিতে। রবি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। সাথী একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। একই গ্রাম, তবে দুজনের বাড়ির মাঝখানে বিস্তীর্ণ একটি বিল। এক কার্তিকের সন্ধ্যায় জলপাই গাছের নিচে রবি একটি চিঠি রেখে আসে। সাথী তখন বাড়ির উঠানে হাঁটছিল। রবি চোখের ইশারায় চিঠিটি তুলে নিতে বলল। চিঠিটি হাতে নিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করল—
‘প্রিয় সাথী,
ছোটবেলা থেকেই তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। শীতের পড়ন্ত বিকেলে তোমাদের বাড়ির সামনের খোলা ধানক্ষেতে আমরা যখন একসঙ্গে বদন খেলতাম; তখন থেকেই তোমার প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করি। খেলতে খেলতে তোমার অঝোর হাসি আজও আমার চোখে ভাসে। তুমি খুব রাগী বলেই কোনো দিন মুখে কিছু বলতে পারিনি। কত শীত গেল, কত গ্রীষ্ম এলো, আবার ঋতু বদলালো; কিন্তু আমার মনের কথাটি আর বলা হয়ে ওঠেনি। তাই আজ সাহস করে চিঠিতে লিখে ফেললাম—আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।
যদি তোমার হৃদয়ের গভীরে আমার জন্য একটুও ভালোবাসা থাকে, তবে কাল বিকেলে উঠানে এসো। আর তোমার উত্তরটি জলপাই গাছের গোড়ায় রেখে যেয়ো। আমি সন্ধ্যায় সেখানে তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকব।
ইতি
রবি’
গল্প / আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি
পরদিন বিকেলে নীল-কালো বাটিকের থ্রি-পিস পরে সাথী বান্ধবির সাথে উঠানে হাঁটছে। রবি দূর থেকে দেখে খুশিতে আত্মহারা। সন্ধ্যায় জলপাই গাছের গোড়ায় একটি ছোট্ট কাগজের টুকরো পেল। হাতে নিয়ে মহাখুশি! কাগজটি পকেটে নিয়ে বাঁশঝাড়ে বসে খুললো। সেখানে লেখা—
‘আমি চিঠি লিখতে পারি না, তাই ফোন নাম্বার দিলাম, রাত আটটায় মেসেজ দিবেন... বাই!’
রবির বিশ্বাস হচ্ছে না। তখন বাটন ফোন। দশ টাকা রিচার্জ করে পাঁচ টাকায় একশ মেসেজ কিনে মেসেজ করল। সেদিন সারারাত তাদের মুঠোফোনে মেসেজ হলো। আস্তে আস্তে সম্পর্ক হয়ে উঠল।
কয়েকদিন পর রবি সাথীকে কাছ থেকে দেখতে চায়। শীতের রাত। গ্রামে রাত নয়টা মানেই গভীর রাত। সবাই ঘুমিয়ে যাচ্ছে। রবি আজ সাথীকে দেখতে যাবে। মেসেজে বায়না ধরেছে। সাথী ভয়ে না করছে। কেউ দেখলে সর্বনাশ। রবি অনেক রিকোয়েস্ট করে বাঁশঝাড়ে গেল।
সাথী পাশের রুমে জানালা খুলে তার জন্য অপেক্ষা করছে। রবি আস্তে করে জানালার পাশে গেল। হাল্কা চাঁদনী রাতে আবছা আবছা আলোয় ফর্সা মুখ ভেসে উঠছে। জানালার পাশে গিয়ে হঠাৎ রবি সাথীর হাতে স্পর্শ করল। ততক্ষণে সাথীর শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রবির হাত-পা কাঁপছে। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে চলে আসল। মেসেজ করতে করতে ফরজের আজান দিলো।
এক বছর পর। সাথীর বাড়িতে কেউ নেই। তার মা বড় বোনের বাড়িতে গেছেন। ঘরে আছে শুধু দাদি আর এক বান্ধবী। রাত ১২টায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচ। সাথী হঠাৎ মেসেজ পাঠাল—‘জানালার পাশে আসো।’
রবি উত্তর দিলো—‘ভয় করছে! যদি কেউ দেখে ফেলে?’
‘কেউ দেখবে না। আম্মু আপুর বাসায় গেছে।’
মেসেজটি পড়েই রবির বুক ধুকপুক করে উঠল। আজ অনেক দিন পর সাথীকে এত কাছ থেকে দেখবে। উত্তেজনায় তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। বাঁশঝাড়ের পাশে এসে সে লিখল—‘জানালা খোলো, আমি এসেছি।’
‘আচ্ছা।’
জানালা দিয়ে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে পড়ল রবি। আশপাশের সবাই বিশ্বকাপের খেলা দেখতে ব্যস্ত। পাশের ঘরে দাদি আর বান্ধবী গভীর ঘুমে। রবির হাত-পা কাঁপছে। সাথী লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রবি ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে কাঁধে আলতো করে হাত রাখতেই সাথীর শরীর শিউরে উঠল। মুহূর্তেই সে ঘুরে রবির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, রবি।’
‘আমিও তোমাকে ভালোবাসি, সাথী।’
‘কোনো দিন আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?’
‘পৃথিবী উল্টে গেলেও না, পাখি।’
কথা শেষ করে রবি স্নেহভরে সাথীর কপালে একটি চুমু দিলো। সাথীর বুক তখনো ধড়ফড় করছে।
‘কেউ যদি দেখে ফেলে? তখন কী হবে?’
রবি হেসে বলল—‘কী আর হবে! আমাকে ধরে বেঁধে রাখবে, সকালে আমাদের বিয়ে দিয়ে দেবে।’
কথাটা শুনে সাথী আবারও রবিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। গল্প করতে করতে কখন যে রাত দুটো পেরিয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না।
এরপর দেখতে দেখতে আরও একটি বছর কেটে গেল।
জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে তিন দিন। অথচ সাথী এখনো বাড়ি ফেরেনি। এই কয়েক দিন তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগও হয়নি। দুশ্চিন্তায় রবির খাওয়া-ঘুম প্রায় বন্ধ। চার দিন পর হঠাৎ একটি মেসেজ এলো।
‘কেমন আছো?’
‘ভালো নেই।’
‘কেন?’
‘কেন, সেটা কি সত্যিই জানো না? এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘আজ ফিরেছি। আপুর বাসায় ছিলাম।’
‘অন্তত একটা মেসেজ দিতে পারতে।’
অভিমানে রবি আর কোনো উত্তর দিলো না। কিন্তু সাথী একের পর এক মেসেজ পাঠিয়েই চলল। তবুও রবির মন গলল না।
সেদিন গভীর রাতে হঠাৎ জানালার বাইরে ক্ষীণ শব্দে ঘুম ভাঙল তার। জানালার কাছে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল—সাথী দাঁড়িয়ে আছে। জানালা খুলতেই সে এগিয়ে এসে রবিকে জড়িয়ে ধরল।
‘সরি, বাবু!’
‘কিসের সরি?’
‘রাগ করো না। পরীক্ষা শেষ করে আপুর বাসায় গিয়েছিলাম। তারপর আর ফিরতে দেয়নি।’
‘অন্তত একটা খবর তো দিতে পারতে।’
‘আপুকে আমি ভীষণ ভয় পাই। জানতে পারলে খুব রাগ করতেন। তাই মেসেজ বা ফোন করার সাহস পাইনি।’
রবি মুখ ফিরিয়ে রইল। সাথী তার হাত দুটো ধরে মৃদু হেসে বলল, ‘লক্ষ্মী বাবু, আর রাগ করে থেকো না...!’
রবির সব অভিমান মুহূর্তেই গলে গেল। সেদিনের পর আবার আগের মতোই চলতে লাগল তাদের ভালোবাসা।
এরই মধ্যে সামনে এলো সাথীর এসএসসি পরীক্ষা। গণিত আর ইংরেজি রবি নিজেই ফোনে পড়াত। প্রতিটি পরীক্ষার দিন সে সাথীকে কেন্দ্রে পৌঁছে দিতো এবং টানা তিন ঘণ্টা গেটের বাইরে অপেক্ষা করত। পরীক্ষা শেষে ভিড়ের মধ্যে সাথীর হাত ধরে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসত। অজান্তেই সে হয়ে উঠেছিল সাথীর অতন্দ্র প্রহরী। শেষ পরীক্ষার দিন তারা গ্রামের দূরের শ্মশানঘাটে গেল। পড়ন্ত বিকেলের নরম আলোয় বিশাল বটগাছের নিচে বসেছিল দুজন। অথচ আজ সাথীর মুখে কোনো হাসি নেই। সে দূর্বা ঘাসের ওপর চুপচাপ বসে চোখ মুছছিল। রবি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? সকাল থেকেই তোমাকে অন্য রকম লাগছে।’
সাথী ধীরে রবির হাতটা ধরে বলল, ‘আজ তোমাকে একটা কথা বলব। অনেক দিন ধরে বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে আছে। আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না। তোমাকে না বললে নিজেকেই ক্ষমা করতে পারব না।
‘এমন কী কথা, যার জন্য তুমি কাঁদছ?’
‘আগে বলো, শুনে আমাকে ভুল বুঝবে না তো?’
‘পৃথিবীর কোনো কথাই তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরাতে পারবে না। বলো।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সাথী বলল, ‘মনে আছে, জেএসসি পরীক্ষা শেষে আমি চারদিন আপুর বাসায় ছিলাম?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে।’
‘সেই রাতেই আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটেছিল।’
রবির বুক ধক করে উঠল—‘কী হয়েছিল?’
সাথীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল—‘আপুর দেবর আদনান আমার ঘরে ঢুকে আমার ওপর জোর করেছিল। আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি...’।
কথাগুলো শেষ করেই সে অঝোরে কেঁদে উঠল।
মুহূর্তের জন্য রবির চারপাশ যেন অন্ধকার হয়ে গেল। মনে হলো, মাথার ওপর থেকে বিশাল একটি বটগাছ ভেঙে পড়েছে। তবু পরের মুহূর্তেই সে নিজের কষ্ট গোপন করে সাথীর চোখের জল মুছে দিলো।
‘সাথী, এতে তোমার কোনো দোষ নেই। এটা তোমার জীবনের একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার জন্য মানুষকে দোষী করা যায় না।’
সাথী কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘মনে হয়, আমি তোমাকে ঠকিয়েছি।’
রবি মাথা নাড়ল—‘না। তুমি আমাকে ঠকাওনি। আমি তোমাকে যেমন ভালোবেসেছিলাম, আজও তেমনি ভালোবাসি। আমার ভালোবাসা শুধু শরীরের জন্য নয়; তোমার মন, তোমার মানুষটাকে ভালোবেসেছি। আমি আজও তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।’
সাথী ভেজা চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘সত্যি... কোনো দিন আমাকে ছেড়ে যাবে না?’
রবি তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তিন সত্যি বলছি, কখনো না। যতদিন বাঁচব, তোমার পাশেই থাকব।’
সাথীর ঠোঁটে বহুদিন পর একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে রবির কাঁধে মাথা রেখে বলল, ‘যে মানুষ আমার সবচেয়ে কঠিন সত্যটাও গ্রহণ করতে পারে, তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি কোনো দিন ভাবতেও পারি না।’
রবি মৃদু হেসে বলল, ‘লাভ ইউ, পাগলি।’
সাথীও হাসল—‘লাভ ইউ টু, বাবু।’
সাথীর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। সে দারুণ ফল করল। আনন্দে আত্মহারা রবি। তার ইচ্ছে ছিল, সাথীকে নিজের উপজেলার কলেজেই ভর্তি করাবে। কাছে থাকলে অন্তত মাঝেমধ্যে দেখা হবে, কথা হবে, স্বপ্নগুলোও পাশাপাশি হাঁটবে। কিন্তু সাথীর ইচ্ছে অন্য। সে জেলা শহরের একটি ভালো কলেজে পড়তে চায়। রবি নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিলো। ভালোবাসা তো প্রিয় মানুষের স্বপ্ন পূরণ করার নাম। তাই জেলার সবচেয়ে নামকরা কলেজেই সাথীকে ভর্তি করিয়ে দিলো। নিজ হাতে মেস ঠিক করে দিলো, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে দিয়ে তবেই ফিরে এলো। সেদিন থেকে যেন রবির পৃথিবী বদলে গেল। মফস্বলের প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি বৃষ্টিভেজা পথ, প্রতিটি নির্জন সন্ধ্যা তাকে শুধু সাথীর কথাই মনে করিয়ে দেয়। মনে হতে লাগল, জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটিকে যেন অনেক দূরে হারিয়ে ফেলেছে। শহরে যাওয়ার পর সাথীও ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। আগে একটি মেসেজ পাঠালে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো পুরো দিন কেটে যায়—তবুও কোনো উত্তর নেই। ফোন করলে বলে, ‘পড়ার অনেক চাপ। সময় পাই না।’
রবি বিশ্বাস করার চেষ্টা করে। তবু বুকের ভেতর অজানা এক শূন্যতা প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হতে থাকে।
ভৌতিক গল্প: কালো ছায়ার জবানবন্দি
একদিন সারারাত কেটে গেল। অসংখ্য মেসেজ, একের পর এক ফোন—কোনোটিরই উত্তর দিলো না সাথী। প্রতিবারই কল কেটে দিলো। পরদিন খুব ভোরেই রবি জেলা শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। সকাল থেকে সাথীর মেসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। শুধু একবার কথা বলবে, জানতে চাইবে—কী এমন অপরাধ করেছে সে? অবশেষে সকাল প্রায় দশটার দিকে সাথী বের হলো। রবি এগিয়ে গিয়ে ডাকল। কিন্তু সাথী যেন তাকে দেখেও না দেখার ভান করল। কোনো রকমে দু-একটি কথার উত্তর দিয়ে কলেজের দিকে হাঁটতে লাগল। রবি পিছু নিলো। কলেজের পুকুরপাড়ে গিয়ে আবারও জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে, সাথী? আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছ কেন?’
সাথী নীরব। যেন রবির প্রশ্নগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছেই না। অভিমান, কষ্ট আর অপমান একসঙ্গে বুকের ভেতর বিস্ফোরিত হলো। কিছুদিন আগে অনেক কষ্টে কেনা নতুন স্মার্টফোনটি বের করে রাগের মাথায় সোজা পুকুরে ছুড়ে মারল রবি। ছপাৎ করে পানিতে ডুবে গেল ফোনটি।
সাথী একবারও ফিরে তাকাল না। কোনো বিস্ময় নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। নির্বিকার মুখে কলেজের ভেতরে চলে গেল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে কলেজের আশপাশেই অপেক্ষা করল রবি। যদি একবার সাথী এসে বলে, ‘চলো, কথা বলি।’ কিন্তু সেই অপেক্ষা সেদিন আর শেষ হলো না।
কয়েক দিন পর হঠাৎ এক সন্ধ্যায় সাথীর ফোন।
‘কাল বিকেলে পার্কে আসবে?’
‘কেন?’
‘কিছু কথা আছে... সামনাসামনি বলব।’
রবির বুকের ভেতর আবারও আশার একটি ছোট্ট প্রদীপ জ্বলে উঠল। এতদিনের নীরবতার পর হয়তো এবার সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।
হঠাৎ সিএনজিচালক বলে উঠল, ‘ভাই, নামেন। এসে গেছেন।’
রবি চমকে উঠল। পুরো দুই ঘণ্টার পথ সে যেন অতীতেই ডুবে ছিল। কখন যে সিএনজি বাড়ির সামনে এসে থেমেছে, সে টেরই পায়নি।
ভাড়া মিটিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটল। চারদিকে শ্রাবণের বৃষ্টি। আকাশের কান্না আর তার বুকের কান্না যেন এক হয়ে গেছে।
রাতভর বিছানায় শুয়েও একমুহূর্ত চোখে ঘুম এলো না। বারবার মনে পড়তে লাগল সাথীর শেষ কথাগুলো—‘আমাদের সম্পর্কটা আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’ তারপর থেকে আর কোনো দিন রবি সাথীকে ফোন করেনি। কোনো মেসেজও পাঠায়নি। যে মানুষকে একদিন নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল, তাকে মুক্তি দেওয়াটাই হয়তো ছিল তার ভালোবাসার শেষ দায়িত্ব।
কয়েক দিন পর বিকেলের দিকে সে একা চলে গেল সেই শ্মশানঘাটে—যেখানে শেষ পরীক্ষার দিন সাথী বলেছিল, ‘তুমি কোনো দিন আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?’ আকাশে আবার কালো মেঘ জমেছে। বাতাসে শতবর্ষী বটগাছের ডালগুলো দুলছে। হঠাৎ বিকট শব্দে একটি বিশাল ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ল। রবি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, ভেঙে পড়েছে শুধু একটি ডাল নয়—ভেঙে পড়েছে তার চার বছরের স্বপ্ন, বিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ। বৃষ্টি ঝরতেই থাকল। শ্মশানঘাটের সেই নীরব বিকেলে, চার বছরের একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা নিঃশব্দে নিজের কবর রচনা করল।
আরও পড়ুন
ফাত্তাহ তানভীর রানার গল্প: তস্কর
এসইউ








