১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর রচনা ও ফণি চক্রবর্তী নির্দেশনায় রাজবন্দিদের উদ্যোগে প্রথম মঞ্চায়িত হয় পথনাটক ‘কবর’। মহান ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতা ও শহীদদের লাশ গুম করার নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত এ নাটকটি সে সময় দারুণ সাড়া ফেলে। শুধু তাই নয়, নাটকটি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে গণমানুষের অধিকার আদায়ের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। এরপর একে একে রচিত এবং প্রদর্শিত হতে থাকে পথনাটক। সেই তালিকায় আজও অমলিন হয়ে আছে নাট্যকার সেলিম আল দীনের উপকূলীয় অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বুর্জোয়া শ্রেণির নির্মম শোষণের চালচিত্র নিয়ে রচিত ‘চরকাকড়া ডকুমেন্টারি’। এটিই হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পথনাটক।

এছাড়া নাট্যকার এসএম সোলায়মানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী চেতনা ও সমাজের সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রচিত ‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’, নাট্যকার মান্নান হীরার পুঁজিবাদ, করপোরেট সংস্কৃতির আগ্রাসন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার হরণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা নিয়ে রচিত ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’ এবং উগ্রবাদের উত্থান এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে রচিত ‘আগুনের জবানবন্দি’, নাট্যকার তপন দাসের স্বৈরাচারী শাসন, হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও চাটুকারি সংস্কৃতি নিয়ে রচিত ‘মহারাজার গুণকীর্তন’, নাট্যকার মাসুম রেজার সাধারণ মানুষের অধিকারবঞ্চিত হওয়ার করুণ চিত্র ঘিরে রচিত ‘কাকলাস’, লিয়াকত আলী লাকীর সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার, যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন এবং নব্য পুঁজিপতিদের শোষণের প্রেক্ষপটে রচিত ‘শেকল’, নাসীর উদ্দীন ইউসুফের ‘রাজাকার আলবদর ওডিসি’, নাট্যকার সাঈদ আহমেদের সীমান্ত হত্যার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘সীমান্ত ট্র্যাজেডি’ দর্শকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। এর বাইরেও বিগত দুই বছরে হাতেগোনা কয়েকটি পথনাটক বেশ সাড়া ফেলে। সেই তালিকায় রয়েছে ড. শাহমান মৈশান রচিত ‘লাল মজলুম’, আমীনুল হক আমিনের ‘চতুর ভোলা’ এবং মোশারফ দোভাষ রচিত পথনাটক ‘কালা চান’।

এক সময় নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কথা বলা রাজপথের এ শক্তিশালী গণমাধ্যমটি কালের গভীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, ‘গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’ বা ‘পথনাটক পরিষদ’ ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করলেও ঢাকার বাইরের দলগুলো অর্থ ও যোগ্য নির্দেশকের অভাবে নতুন প্রযোজনা রাস্তায় নামাতে পারছে না। চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা খুলনার মতো বিভাগীয় শহরগুলোতেও আগের মতো নিয়মিত পথনাটকের দেখা মেলে না। স্থানীয় জেলা শিল্পকলা একাডেমির মাঠগুলো প্রায়ই সরকারি ও রাজনৈতিক সভার কাজে ব্যস্ত থাকে, যার ফলে স্থানীয় নাট্যকর্মীরা রাজপথে মুক্ত নাটক প্রদর্শনের ন্যূনতম জায়গা বা নিরাপত্তা পান না। তাছাড়া আর্থিক সংকটও নিত্যদিনের চিত্র। শুধু তাই নয়, নাট্যকর্মীদের মতে, নাটক যখনই কোনো বিশেষ দলের তোষামোদি ছেড়ে গণমানুষের কষ্টের কথা বলতে শুরু করে, তখনই তার ওপর নেমে আসে নানামুখী চাপ। যা নিয়ে নানা মহলে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়া তালিকায় নাম লেখাবে দেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পথনাটক।

বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মঞ্চ ও পথনাটকে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই। বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ গিয়াস বলেন, ‘পথনাটক হলো মেহনতি মানুষের শিল্প। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা শহরের উন্মুক্ত মঞ্চগুলো বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অনুদান হিসাবে কারও কাছ থেকে যে নামমাত্র অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া খরচের বাজারে প্রডাকশন চালানো অসম্ভব।’ পথনাটক নির্দেশক ও থিয়েটার ৫২-এর সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘মানুষের পকেট থেকে সামান্য অনুদান নিয়ে এ ধরনের প্রোডাকশন নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। পথনাটককে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রীয় বিশেষ অনুদান দরকার।’ প্রাচ্যনাট সদস্য ও অভিনেত্রী তৃষ্ণা সরকার বলেন, ‘উন্মুক্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে শত শত পুরুষের চোখের সামনে অভিনয় করা একজন নারীর জন্য এখনো এক বড় মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। প্রায়ই কটূক্তির শিকার হতে হয়। এ অনিরাপত্তার কারণেই অনেক মেয়ে মাঝপথে পথনাটক করা ছেড়ে দিচ্ছে।’ অভিনেত্রী তৃষ্ণা সরকারের কথার সঙ্গে পুরোপুরি সহমত পোষণ করেন মঞ্চ ও পথনাটক অভিনেত্রী সানজিদা প্রীতি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজ এখনো রাজপথে নারীদের অভিনয়কে সহজভাবে নেয় না। প্রায়ই সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। পথনাটক করতে এসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা এখনো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ও নাট্য নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘ঢাকার বাইরে বিশেষ করে মফস্বল শহরগুলোতে পথনাটকের নিয়মিত চর্চা একপ্রকার থমকে গেছে। আমাদের উচিত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পথনাটকের দলগুলোকে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া।’

দেশের পথনাটক বর্তমানে ক্রান্তিকাল পার করছে। এটি একদিকে যেমন কিছু নাট্য সংগঠন রাজধানীকেন্দ্রিক পথনাটক চর্চা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তেমনি মফস্বলের স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক অনটন একে কোণঠাসা করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা সব বাধা পেরিয়ে পথনাটক গণ-মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে আবারও রাস্তায় ঝড় তুলবে।