বাংলাদেশ ওয়ানডে দলে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের প্রত্যাবর্তনটা হয়েছে স্বপ্নের মতোই। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ১১৬.২৯ স্ট্রাইকরেটে করেছেন ১৫৭ রান; ফিফটি দুটি। এ ছাড়া ৪.৩৮ ইকোনমিতে নিয়েছেন ২ উইকেট। তাঁর এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্রথমবার অজিদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ; মোসাদ্দেক হয়েছেন সিরিজসেরা। প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে ৮৬ রানের পাশাপাশি ২ উইকেট নিয়ে জিতেছিলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পুরো আলোটাই যেন ছিল তাঁর দিকে। এমন স্মরণীয় একটি সিরিজ শেষে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে আছেন মোসাদ্দেক। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে অভিষেক হলেও এই সিরিজকে ক্যারিয়ারের নতুন শুরু হিসেবে দেখছেন তিনি। দারুণ প্রত্যাবর্তনের পর নিজের অনুভূতি, লক্ষ্য, বাজে সময়ের গল্প, পরিশ্রমসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন মোসাদ্দেক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কারিমুল ইসলাম

প্রশ্ন: প্রায় চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে সিরিজসেরা হলেন। এই যাত্রা কীভাবে বর্ণনা করবেন?

মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত: অবশ্যই অনেক ভালো লাগছে। অনেক দিন ধরে একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের একটা চাপ তো সব সময় ছিল। যখন ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করেছি, তখন প্রত্যাশা ছিল, যেকোনো সময় হয়তোবা সুযোগ আসবে। সেই সুযোগটা পেয়েছি।

প্রশ্ন: জাতীয় দলের বাইরে থাকার সময়টা কতটা কঠিন ছিল?

মোসাদ্দেক: অনেক কঠিন ছিল। জাতীয় দলে যারা খেলছিল, তারা তো ভালো করছিল। দল মাঝখানে কয়েকটা সিরিজ জিতেছে। তাই আমার জন্য ফেরাটা এত সহজ ছিল না। বাইরে থাকার সময়টাতে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফর্ম না করতে পারলে আমার জন্য ফেরাটা অনেক কঠিন হতো। ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সটাকে আমি এগিয়ে রাখব। এটা না হলে হয়তো আর সুযোগ পেতাম না।

প্রশ্ন: কখনো কি মনে হয়েছিল, দলে ফেরার সুযোগ হয়তো আর আসবে না?

মোসাদ্দেক: সত্যি কথা বলতে এ রকম কখনোই মনে হয়নি। কারণ, আপনি যখন ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করতে থাকবেন, তখন এটা মনে হবে না। ঘরোয়া ক্রিকেট তো জাতীয় দলের পাইপলাইন। এই জায়গায় পারফর্ম করতে থাকলে অবশ্যই একটা সুযোগ আসবে। আমি সেটা করেছি। ঘরোয়াতে যখন ভালো খেলছিলাম, তখন আশাটা একটু বেড়েছে। ভেবেছি আবার সুযোগ আসতে পারে। মনে হয়নি যে আর কখনো সুযোগ আসবে না।

প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স কি আপনার আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে মনে করেন?

মোসাদ্দেক: এমন পারফরম্যান্স করলে অবশ্যই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এই সিরিজের পর নিজের প্রতি প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সঙ্গে ভালো খেলার পর এখন সামনে যে সিরিজগুলো আছে, সেগুলোতে আমাকে ভালো খেলতে হবে। অনুশীলনের সময় বিষয়টা মাথায় রেখেই অনুশীলন করছি। এই সিরিজ অবশ্যই আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আসল কাজ হলো, এমন ফর্ম ধরে রাখা।

প্রশ্ন: দল থেকে বাদ পড়ার পর স্বাভাবিকভাবে কঠিন সময় পার করেছেন। দুঃসময়ে কারা আপনার পাশে ছিলেন বা সমর্থন করেছেন?

মোসাদ্দেক: অনেকে পাশে ছিলেন। আলাদাভাবে বলা কঠিন। তবে ওই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন স্যার। এ ছাড়া আমার পরিবার, বন্ধুরা এমনকি শুভাকাঙ্ক্ষীরাও পাশে ছিলেন, সমর্থন করেছেন। আমি অবশ্যই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁরা আমার এমন সময়ে পাশে ছিলেন।

প্রশ্ন: যখন জানতে পারলেন, আপনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে দলে ফিরছেন, এরপর এই সিরিজ নিয়ে বিশেষ কোনো লক্ষ্য ছিল কি না?

মোসাদ্দেক: না, আমি আসলে সেভাবে চিন্তা করিনি। প্রথম ওয়ানডে খেলার দুই-তিন দিন আগে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে (ডিপিএল) আবাহনী লিমিটেডের হয়ে খেলছিলাম। মনোযোগ সেখানেই ছিল। তাই অস্ট্রেলিয়া সিরিজে অনেক বেশি চাপ নিতে হবে বা ভালো খেলতে হবে, এমন কিছু ভাবিনি। ভালো করার ইচ্ছা সব সময় থাকে। তবে সেভাবে ভাবিনি। এভাবে চিন্তা করলে কাজটা অনেক কঠিন হতো। পরিকল্পনা ছিল, প্রিমিয়ার লিগে যেভাবে খেলছিলাম, ঠিক সেভাবেই খেলব। সেটাই করার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: দল থেকে বাদ পড়ার পর নিজের পারফরম্যান্স উন্নতি করতে বা নিজেকে বদলাতে কী করেছেন?

মোসাদ্দেক: যারা জাতীয় দলের বাইরে থাকে, তাদের জন্য মিরপুরে এসে বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। ওই সময় নিজের মতো করে অনুশীলন করতে হয়। তবে আমার চেষ্টার কমতি ছিল না। যখনই খেলার বাইরে ছিলাম, ওই সময়টাতে ক্রিকেটার্স একাডেমিতে প্রচুর অনুশীলন করেছি। সেখানে সব সময় কোচ, ট্রেইনাররা থাকেন। যখনই সময় পেয়েছি, সেখানে অনুশীলনের চেষ্টা করেছি। ম্যাচ বা টুর্নামেন্টের জন্য প্রস্তুত ছিলাম সব সময়। সব সময় মনে হতো, আমি খেলার জন্য প্রস্তুত। অনুশীলন করে সব সময় ম্যাচের জন্য প্রস্তুত থাকতাম। যেন সুযোগ পেলেই ভালো করতে পারি।

প্রশ্ন: ওয়ানডে প্রত্যাবর্তনের ৮৬ রানের ইনিংসের পাশাপাশি ২ উইকেট নিয়েছিলেন। আপনার পারফরম্যান্সে দল জিতেছে; আপনি ম্যাচসেরা হয়েছেন। এমন স্বপ্নের মতো প্রত্যাবর্তন আশা করেছিলেন?

মোসাদ্দেক: সত্যি কথা বলতে এভাবে আশা করিনি। পরিকল্পনা ছিল, আমার যে ভূমিকা মানে ছয় নম্বরে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিং—সেসব ঠিকভাবে করা। যখনই সুযোগ আসবে, দলের প্রয়োজনে প্রভাব বিস্তার করে খেলব। পরিস্থিতি যা চাইবে, সেভাবেই চেষ্টা করব। এর বাইরে কিছুই চিন্তা করিনি। প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে এত ভালো খেলতে হবে, সেসব নিয়ে ভাবিনি।

প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া সিরিজে এমন পারফরম্যান্স দেখে অনেকে বলছেন, আপনাকে দিয়ে বাংলাদেশ ছয় নম্বর পজিশনের সমাধান পেয়ে গেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মোসাদ্দেক: ছয়-সাতে ব্যাটিং করা সহজ নয়। কঠিন পরিস্থিতি থাকে। প্রতিদিন একই রকম পারফর্ম করতে পারবেন, সেটা আশা করাও ঠিক হবে না। সব সময় এক রকম হবে না। অনেক সময় এমন পরিস্থিতি থাকে, যখন ৪০ রানে ৪ উইকেট পড়তে পারে, আবার ২০০ রানেও ৪ উইকেট পড়তে পারে। ২০০ রানে ৪ উইকেট পড়লে সেখান থেকে ৩০০ রানের জন্য খেলতে হবে। আবার ৪০ রানে ৪ উইকেট পড়লেও সেখান থেকে ইনিংস বড় করার দায়িত্ব থাকে। এটা সব সময় সহজ হয় না। এই পজিশনে সবার প্রত্যাশাও বেশি থাকে। এই পজিশনে যে-ই খেলুক না কেন, তাকে সময় দিতে হবে। কেউ ব্যর্থ হলে সঙ্গে সঙ্গেই যেন মনে না হয় যে তাকে দিয়ে কিছুই হবে না। এভাবে চিন্তা না করে সময় দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনা সম্ভব।

প্রশ্ন: সিরিজে নিজের ব্যাটিংয়ের কোন দিকটি আপনাকে বেশি সন্তুষ্ট করেছে?

মোসাদ্দেক: সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে এ জন্য যে যেভাবে ব্যাটিং করতে পছন্দ করি, ঠিক সেভাবে ব্যাটিং করতে পেরেছি। আমি একটু আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে পছন্দ করি। হয়তো অনেক সময় ব্যর্থ হই। কিন্তু এভাবেই খেলতে পছন্দ করি। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে স্বভাবসুলভ ব্যাটিং করতে পেরেছি। সন্তুষ্টির জায়গা এটাই। স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলতে পেরেছি।

প্রশ্ন: আপনি নিয়মিত ১০ ওভার বোলিং করার সুযোগ পান না। বোলিংয়ে আপনাকে আরও বেশি ব্যবহার করা হলে সে ক্ষেত্রে কতটা প্রস্তুত আছেন?

মোসাদ্দেক: ক্যারিয়ারের শুরু থেকে যদি বলি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে আমি যেখানেই খেলেছি, সেখানেই ১০ ওভার বল করেছি। বেশির ভাগ সময় এটা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার ভূমিকাটা এমন যে ছয়-সাতে ব্যাট করব, পাশাপাশি পাঁচ থেকে ছয় ওভার বল করব। নিজের ভূমিকা নিয়ে সব সময় পরিষ্কার ছিলাম। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের কথা যদি বলি, সেখানে বোলিংয়ের সুযোগ বেশি থাকে। এ জন্য ১০ ওভার বল করা হয়। যেটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের থেকে আলাদা। দল থেকে যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়, আমি সেভাবেই প্রস্তুত থাকি সব সময়। তাই বলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ ওভার বল করিনি, বিষয়টা তেমন নয়। অবশ্যই করেছি। আমি তো চাই ১০ ওভার বোলিং করতে।

প্রশ্ন: নিজেকে আগে ব্যাটার, নাকি অলরাউন্ডার হিসেবে দেখতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন?

মোসাদ্দেক: আমি সব সময় ব্যাটিং অলরাউন্ডার। নিজেকে সেভাবেই দেখি—আগে ব্যাটিং তারপরে বোলিং। মোটকথা, আমি একজন ব্যাটিং অলরাউন্ডার।

প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া সিরিজে দারুণ পারফরম্যান্সের পর আপাতত দলে স্থায়ী হয়েছেন। ধারাবাহিকতা থাকলে ২০২৭ বিশ্বকাপের দলেও জায়গা পাবেন। যেহেতু সময়টা ভালো যাচ্ছে, বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মোসাদ্দেক: অনেক দিন পর দলে ফিরে শুধু একটা সিরিজ খেললাম। এখনই বিশ্বকাপ নিয়ে পরিকল্পনা নেই। সেভাবে দূরের কিছু নিয়ে কখনো পরিকল্পনা করি না। বিশ্বকাপ হবে ২০২৭ সালের অক্টোবরে। সেই বিশ্বকাপের আগে অনেকগুলো সিরিজ আছে। সেগুলোতে ভালো খেলতে হবে। আপাতত লক্ষ্য এটাই। আমি প্রতিটি সিরিজ ধরে ধরে চিন্তা করি। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই চাইব যেন পরের বিশ্বকাপে খেলতে পারি। কিন্তু তার আগে যে সিরিজগুলো আছে, সেগুলোতে অবশ্যই ভালো খেলতে হবে।

প্রশ্ন: ব্যর্থতা কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন ওয়ানডেতে আবার দারুণ করছে। এমন ফর্মের পর ২০২৭ বিশ্বকাপে দলের ভালো করার সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?

মোসাদ্দেক: আমার মনে হয়, দল হিসেবে দেখলে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে দারুণ করছে; বিশেষ করে বোলিং বিভাগের কথা বলতেই হয়। আমি তো সব সময় বলি, এখন যে বোলিং আক্রমণ আছে, এটাকে বিশ্বের সেরা তিন বা চার নম্বরে রাখা যায়। এখন মাশাআল্লাহ আমাদের বোলাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেভাবে বোলিং করছে, সেদিক থেকে বিশ্বকাপে ভালো কিছু আশা করা যেতেই পারে। আমি চাইব, যেন বাংলাদেশ সেমিফাইনাল খেলতে পারে।

প্রশ্ন: চার বছর আগের মোসাদ্দেক আর এখনকার মোসাদ্দেকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?

মোসাদ্দেক: চার বছর আগেও আমি ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছি। ঘরোয়া ক্রিকেট ছাড়াও মাঝখানে ‘এ’ দলের হয়ে খেলেছি। এ ছাড়া হংকংয়ে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেছি। আমার মনে হয়, একজন ক্রিকেটার যত বেশি ম্যাচ খেলে, তত অভিজ্ঞতা বাড়ে। ওই জায়গা থেকে বলব, এত ম্যাচ যেহেতু খেলেছি, এসব আমাকে বাড়তি অনুপ্রেরণা দেয় সব সময়।

প্রশ্ন: দলে ফেরাকে কি নতুন শুরু কিংবা নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন?

মোসাদ্দেক: অবশ্যই, এটা আমার জন্য নতুন সুযোগ। এটি ভালোভাবে নিতে হবে এবং ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। যত দিন ক্রিকেট খেলব, অবশ্যই চাইব পুরো সময়টাতে যেন দেশকে জেতাতে পারি। সেভাবেই যেন ক্যারিয়ারটা শেষ করতে পারি।