অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে মাসে এক হাজার ডলার বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটা যে প্রলোভন তা জানা ছিল না। চাকরি দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো পাচার করে দেওয়া হয়েছিল কাজাখস্তানে। চার মাস দুর্বিষহ জীবনে যেন সাক্ষাত মৃত্যুকে দেখেছেন। অবশেষে কৌশলে পালিয়ে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন। কিন্তু নিঃস্ব হয়ে।
হতভাগ্য ওই যুবকের নাম সোহেল রানা জুয়েল (৩৮)। তিনি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ঘোপদুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ভুক্তভোগী সোহেল রানা জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি মালয়েশিয়া যান। সেখানে একটি হোটেলে শেফের কাজ করতেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সেখানে পরিচয় হয় দালাল নুরজাহানের সঙ্গে। তিনি (সোহেল) ইউরোপে যাওয়ার কথা জানান। দেশে ফিরে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চুক্তি চূড়ান্ত হয়। ৬-৮ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা দেন দালাল নুরজাহান।
অস্ট্রেলিয়ায় ভালো কাজ দেওয়ার কথা বলে দালাল তার সঙ্গে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করেন। প্রথমে ১২ লাখ টাকা দিতে হবে। দেশটিতে যাওয়ার পর বাকি চার লাখ। কিন্তু ১২ লাখ টাকা দিলেও তাকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাননি চক্রের সদস্যরা।
সোহেল বলেন, চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়া হলেও নুরজাহান তাকে আজ না কাল বলে ঘুরাতে থাকেন। অবশেষে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি বিজনেস ভিসায় এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই। সেখান থেকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানে। দেশটির হোটেলে থাকাকালেই শুরু হয় নির্যাতন।
ওই হোটেলে আরও দুই বাংলাদেশির সঙ্গে সোহেলের পরিচয় হয়। তিনজনের কাছ থেকেই পাসপোর্ট কেড়ে নেন নুরজাহানের প্রতিনিধি। এরপর ২৪ জানুয়ারি একটি প্রাইভেটকারে তাদের তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হয় হোটেল থেকে প্রায় ৯০০ কিমি. দূরে শিমক্যাট নামে একটি ফাঁকা কারখানার মতো একটি জায়গায়।
দালালের প্রতিনিধি জানান, এখান থেকে বের হতে হলে তাকে ৩০ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। এরপর ২৮ তারিখ রাতে তারা তিনজন (নোয়াখালীর মিজান ও নারায়ণগঞ্জের হালিম) একসঙ্গে পরামর্শ করেন সেখান থেকে পালাবেন। হালিম রাজি হননি। পরে মিজানকে সঙ্গে নিয়ে সোহেল সেখান থেকে পালান।
এ অবস্থায় ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের নম্বরে তারা খুদে বার্তা পাঠিয়ে বিপদের কথা জানান। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী সব শুনে সোহেলকে দেশে পাঠাতে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। সোহেলের স্ত্রী ধার-কর্জ করে টাকা পাঠালে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে সোহেল ২০ এপ্রিল দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
স্বামীকে পাচার করে দেওয়ার খবর পেয়ে গত ৯ মার্চ যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি মামলার আবেদন করেন তার স্ত্রী মুক্তা বেগম। আদালতের নির্দেশে ৬ এপ্রিল বাঘারপাড়া থানায় মামলা রেকর্ড হয়।
মামলায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার মুসলিমনগর গ্রামের মো. কাইয়ুম (৪৮) ও তার স্ত্রী নাজমা আক্তারকে (৪৫) আসামি করা হয়। তবে পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, মামলার একজন আসামি দেশের বাইরে রয়েছেন। আরেকজন দেশে থাকলেও খোঁজ পাইনি। দালাল নুরজাহানের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
মিলন রহমান/এসআর/এমএস








