চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ৮ কোটি টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের টেন্ডারে জালিয়াতি-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হয়। কারসাজির মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। মালামাল বুঝে পাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বিপুল অর্থ উত্তোলন করে নিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭ টাকার ঠিকাদারি কাজে এই অনিয়ম হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থ বছরে সরবরাহের জন্য ২৫ জানুয়ারি একাধিক প্যাকেজে জেনারেল হাসপাতালে এমএসআর নন ইডিসিএল মেডিসিন, গজ, সুতা, রিএজেন্ট কেমিক্যাল, সার্জিকেল যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, লিনেল, কম্পিউটার ও অ্যাক্সেসরিস কেনার দরপত্র আহ্বান করে কর্তৃপক্ষ। এই টেন্ডারে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। কিন্তু নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন। এতে বলা হয়, জেনারেল হাসপাতালের আহ্বান করা আলোচ্য টেন্ডারে একাধিক প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে-শাদমান এন্টারপ্রাইজ, জমজম এন্টারপ্রাইজ, শাহ আমানত মেডিকেল হল, আলী অ্যাসোসিয়েটস সব শর্ত পূরণ করে অংশ নেয়। তা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানকে অগ্রহণযোগ্য বা ননরেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। এমএসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথ কেয়ার নামে দুটি ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠান দুটির পাওয়া কাজের মধ্যে রয়েছে, নন ইডিসিএল মেডিসিনের (টেন্ডার নম্বর ১২০৬০৬৯) ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনা প্যাকেজের ২ কোটি ৬৮ লাখ। এছাড়া কেমিক্যাল, রিএজেন্ট, গজ ও সুতা সরবরাহের আরেকটি টেন্ডারও বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

একই ডকুমেন্ট জমা দেওয়ার পরও ‘শাহ আমানত মেডিকেল হল’কে এক প্যাকেজে নন রেসপন্সিভ দেখানো হয়েছে। আবার আরেক প্যাকেজে রেসপন্সিভ দেখানো হয়েছে। কিন্তু রেসপন্সিভ দেখানোর পরও কাজ দিয়ে দেওয়া হয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান, ‘এমএসএম বাংলাদেশ’ ও ‘এমএসএম হেলথকেয়ার’কে।

শাহ আমানত মেডিকেল হল নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আবুল কাশেম যুগান্তরকে বলেন, টেন্ডারে একই মালিকের দুই ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে অনিয়ম করা হয়েছে। মালামাল সরবরাহের আগেই বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে এমএমসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথকেয়ার।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের মেডিসিনসহ বিভিন্ন মালামাল সরবরাহের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনৈতিকভাবে এমএসএম বাংলাদেশ ও এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কাজ দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে সত্যতা পাওয়ায় ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসিদ্ধি হয়নি। উপরন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ পাওয়ায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মান্নানকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তারই উত্তরসূরি ২০২৪-২০২৫ সালের দরপত্রের ফাইল অনুমোদনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। উক্ত অর্থ বছরের সমুদয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত যায়।

এম রহমান অ্যান্ড কোং নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নাছির উদ্দিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কাজ বাগিয়ে নিতে একই পরিবারের দুটি প্রতিষ্ঠান এবার ‘সফল’। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান দুটিকে ৭ কোটিরও বেশি টাকার টেন্ডার দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেন, আরএমও আশিক আমান ও অ্যাকাউন্টস অফিসার নাসির উদ্দিন খালেদকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা সাড়া দেননি।