বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন শরণার্থীদের আশা ও সাহসের প্রতীক। পাপেট শোর মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর অনন্য ভূমিকার কারণে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘পুতুলওয়ালা’ নামে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান টেলিভিশনের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান মুস্তাফা মনোয়ার। সেখানে ব্যারাকপুরসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে পাপেট শোর আয়োজন করে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মধ্যে সাহস ও আশার সঞ্চার করেন। তার পাপেটে অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকী দৃশ্য তুলে ধরা হতো। এসব প্রদর্শনী শরণার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

ধীরে ধীরে শরণার্থী শিবিরে তার পাপেট শো হয়ে ওঠে বিনোদন ও মানসিক শক্তির উৎস। বিশেষ করে শিশুরা তাকে ‘পুতুলওয়ালা’ বলে ডাকত। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এর চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের ধারণ করা ফুটেজেও সেই স্মরণীয় মুহূর্তগুলো সংরক্ষিত রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। দীর্ঘদিন তিনি ফুসফুসে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ও নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান।

নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও পরে শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

কর্মজীবনে তিনি চারুকলার শিক্ষক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টেশন প্রযোজক ও পরে মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালে বিটিভির জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-র রূপকার ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৪ সালে একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা লাভ করেন।

 

এলআইএ