বাবার জানাজায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মহলে গভীর উদ্বেগ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত আলী খামেনির জানাজার দ্বিতীয় দিনে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর তিন ছেলে—মোস্তফা, মেয়সাম এবং মাসুদকে নামাজের অগ্রভাগে দেখা গেছে। এই বিশেষ জানাজায় ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডাররাও উপস্থিত ছিলেন। তবে চলতি বছরের মার্চে বাবার স্থলাভিষিক্ত ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় জমায়েতে কোথাও দেখা যায়নি, যা একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের এটাই প্রথম জনসমক্ষে আসা, আর সেখানেই প্রধান নেতার অনুপস্থিতি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স অবশ্য মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ মহলের বরাত দিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে বিমান হামলায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন, সেই একই হামলায় মোজতবা খামেনির মুখমণ্ডল ও দুই পায়ে মারাত্মক আঘাত লেগেছে। তবে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত করেনি কিংবা নতুন নেতার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সংঘাতের সময় ইসরায়েল প্রকাশ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার যে হুমকি দিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই চরম নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হিসেবে নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে আপাতত জনসাধারণের চোখের আড়ালে রাখা হচ্ছে।

জানাজায় অংশ নেওয়া শোকগ্রস্ত এক ইরানি তাসনিম নিউজকে বলেন, মোনাজাত ও জানাজা শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সবাই আশা করেছিলেন মোজতবা খামেনি নিজে আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর দেখা না মেলাটা সবার মাঝে তীব্র হতাশা তৈরি করেছে। এদিকে ইরান সরকার খামেনির এই মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী এক বিশাল রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, যাকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিদেশি কূটনীতিকদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর আলী খামেনির কফিনটি তাঁর নিহত কন্যা, জামাতা, পুত্রবধূ এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনির কফিনের পাশে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে। মোসাল্লায় রাতভর লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়ে বুক চাপড়ে ও অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের নেতার জন্য প্রার্থনা করছেন। তেহরান মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত থেকে রোববার সকালের মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ যাতায়াত করেছেন।

আজ সোমবারও তেহরানে এই বিশাল শোকযাত্রা অব্যাহত রয়েছে, যা আগামীকাল মঙ্গলবার ধর্মীয় শহর কোমে স্থানান্তরিত হবে। এরপর বুধবার কফিনগুলো ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা পরিভ্রমণ শেষে বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের জন্য ফিরিয়ে আনা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চার মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মাঝে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওসকে জানিয়েছেন, ইরানের এই বিশাল জানাজা ও শেষকৃত্যের সম্মানার্থে শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হওয়া এই ঐতিহাসিক জানাজায় রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ভাহিদীসহ ইরানের প্রায় সব শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত থেকে সাবেক সর্বোচ্চ নেতার প্রতি তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।