তৃতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে তিন মাসের মাথায় দেশের ৫৫তম বাজেট ঘোষণা করল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সাড়ে ১৫ বছরের সীমাহীন অপশাসন, দুর্নীতি আর লুটপাট দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, অতীতের মতো এবারের বাজেটে জনগণের স্বার্থ, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ যেন উপেক্ষিত না হয়; কিন্তু এটি ঠিক, অতি দীর্ঘ সময়ের অপশাসন এবং লুটপাটের মাধ্যমে যে পর্যায়ে অর্থনীতিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘দৃষ্টিভঙ্গি’। এবারের বাজেট জনতুষ্টিমূলক এবং উচ্চাকাক্সক্ষী; বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাগুলোর পেছনে যথেষ্ট বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের দিকনির্দেশনা নেই।
প্রথমেই দৃষ্টি দেওয়া যাক মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার দিকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি কমাতে বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি গ্রহণ করার পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি।
এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা উদ্বেগের। কারণ এটা বাস্তবসম্মত নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে। এ অবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব। বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেটিকে ‘উচ্চাভিলাষী’ অভিহিত করে তা অর্জন খুবই কঠিন হবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক ঋণমান প্রতিষ্ঠান ফিচ। সরকার যেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করছে, সেখানে ফিচের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
এবারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ১৩.৮৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর প্রায় ৯.৭ শতাংশ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রধান প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। এরপরও সরকারের হিসাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ১১ শতাংশ। পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকি বাদ দিলে এ বরাদ্দ দাঁড়াবে ১ শতাংশের মতো। অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মান অনুযায়ী, একটা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ।
এবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশ। এটি এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ, যা মোট জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের মতো দেশের জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা উচিত। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাতে ব্যয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন তো বটেই, পৃথিবীর সবচেয়ে নিচুতে অবস্থান করা দেশ। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের চরম অপ্রতুলতার কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির খরচ-এর হিস্যা ৭৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। চিকিৎসা ব্যয় মেটানো এ দেশের মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। প্রতি বছর কমপক্ষে ৬৫ লাখ মানুষ এ কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।
কালোটাকা সাদা করা নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও শোরগোল হচ্ছে যৌক্তিক কারণেই। তবে এবার এ সুযোগ রাখার বিষয়টি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাট, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালোটাকার মালিকরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে কিংবা দেশে আত্মগোপনে আছে এবং এ অবৈধ টাকা নিরাপদ করার চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিলের কাঠামো থেকে শুরু করে প্রায় সব যন্ত্রাংশের ওপর কর দুই তৃতীয়াংশের বেশি কমানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) চার্জিং স্টেশনে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও নিবন্ধন ফি কমানো হয়েছে। এ উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে বাজেটে এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতেও শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি কমানোর কথা বলা হলেও প্রণোদনা বন্ধ হচ্ছে না। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বিশাল বাজেটের তুলনায় সামান্য বরাদ্দ দিয়ে এ সময়ের মধ্যে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। জ্বালানি তেল, কয়লা এবং এলএনজি আমদানিতে সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার ওপরই সরকার গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, এক দশকের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে। এতে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। একই সঙ্গে ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণের কিছুটা চেষ্টা করেছে। সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাট, দুর্নীতিতে ধসে পড়া অর্থনীতির বাস্তবতায় কয়েক বছরের মধ্যেই সরকার বিস্ময়কর কিছু করতে পারবে, সেই আশা করাও সমীচীন নয়। তবে এ বাজেটে একটা মাইলস্টোন সেট করা যেত, যা পরবর্তী সময়ে একটা গাইডলাইন হিসাবে কাজ করত। কিন্তু এ ধরনের কোনো পথনির্দেশনা বা মাইলস্টোন প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। এ কারণে অর্থনীতির ‘কম্প্রেহেন্সিভ রিফর্ম’-এর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা, পথনির্দেশনা এবং মাইলস্টোন প্রস্তাবিত বাজেটে সংযুক্ত করা জরুরি।
সাকিব আনোয়ার : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক








