কক্সবাজার সৈকতের যে বালু মাড়িয়ে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ঘুরে বেড়ান, তাতেই লুকিয়ে আছে কয়েক বিলিয়ন ডলারের খনিজসম্পদ। মহাকাশ প্রযুক্তি, জেট ইঞ্জিন কিংবা পারমাণবিক শিল্পে ব্যবহৃত এই মহামূল্যবান খনিজের নাম ‘জিরকন’। কক্সবাজার থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৭টি স্থানে শনাক্ত হয়েছে এই খনিজভান্ডার। প্রচলিত হিসাবে জিরকনের মজুত প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন; যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্য কয়েক দশকের পুরোনো। প্রকৃত মজুত আরও অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই সম্পদ আজও অবহেলায়। অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ ও বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও কোনো সরকারই সাড়া দেয়নি। কক্সবাজারের খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রটিও এখন স্থবির। ৮০ জনের জনবল কাঠামোয় কাজ করছেন মাত্র চারজন, যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই অচল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কক্সবাজারের বালুতে জিরকনের পাশাপাশি আছে ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট ও মোনাজাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজও। পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে তা দেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানে এক নতুন দিগন্ত উম্মোচন করবে।
জিরকনের ব্যবহার ও বৈশ্বিক বাজার : ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার জিওলজিক্যাল সায়েন্সেস-এর মুখ্য ভূতত্ত্ববিদ ড. মোহাম্মদ রাজীব জানান, আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল জিরকন। এ থেকে উৎপাদিত জিরকোনিয়াম ও এর যৌগ উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প, জেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা শিল্প, উচ্চমানের সিরামিক ও রিফ্র্যাক্টরি শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীন বিশ্বের প্রধান জিরকন উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তিনি আরও জানান, জিরকনের পাশাপাশি কক্সবাজার উপকূলে পাওয়া ইলমেনাইট ও রুটাইল টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল; যা রং, প্লাস্টিক ও কাগজসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। ম্যাগনেটাইট ও গারনেট ধাতব শিল্প ও ঘর্ষণ উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে মোনাজাইটে থাকা বিরল মৃত্তিকা ও তেজস্ক্রীয় উপাদান উন্নত ইলেকট্রনিকস, শক্তিশালী চুম্বক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসাবে বিবেচিত হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব খনিজের সম্মিলিত উপস্থিতি কক্সবাজার উপকূলকে একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত খনিজ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
কক্সবাজারসহ ১৭ স্থানে মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধান : কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের (বিএসএমইসি) গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে ১৭টি স্থানে বিরল ভারী খনিজভান্ডারের অস্তিত্ব মিলেছে। এরমধ্যে ১৫টি কক্সবাজার জেলায় এবং বাকি দুটি নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটায়।
তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে ছয়টি পৃথক খনিজভান্ডার চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া মহেশখালীতে সাতটি, মাতারবাড়ীতে একটি ও কুতুবদিয়ায় একটি খনিজভান্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে এসব ভান্ডারের কোনোটিরই এখনো সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ বা সুরক্ষিতভাবে চিহ্নিতকরণ করা হয়নি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা এবং জরিপ তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টন বালুর মধ্যে আনুমানিক ৪৪ লাখ টন জিরকনসহ অন্য ভারী খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। এরমধ্যে শুধু জিরকনের মজুত প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। এছাড়া ইলমেনাইটের মজুত প্রায় ১০ লাখ ৮ হাজার টন, রুটাইল ১ লাখ ৯১ হাজার টন, গারনেট ৩ লাখ ৫১ হাজার টন, ম্যাগনেটাইট ২ লাখ ৬৭ হাজার টন এবং মোনাজাইট প্রায় ১৭ হাজার টন।
বাংলাদেশের জিরকনের বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৬ শতাংশ : এক গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের জিরকনের বিশুদ্ধতা আন্তর্জাতিক মানের। বিএইসি-র কক্সবাজার পাইলট প্ল্যান্ট থেকে সংগৃহীত নমুনার রাসায়নিক বিশ্লেষণ, এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন ও মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষায় গবেষক এস. নাহার ও অধ্যাপক এ. এস. এম. এ. হাসিব দেখেছেন, বাংলাদেশের জিরকনের বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এতে প্রধান অমিশ্রণ টাইটানিয়াম অক্সাইড (প্রায় ৩.১ শতাংশ), পাশাপাশি সামান্য আয়রন অক্সাইড ও অন্যান্য উপাদান রয়েছে। মাইক্রোস্কোপিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নমুনার প্রায় ৯৪ শতাংশ জিরকন এবং বাকি অংশে রুটাইল, ইলমেনাইট ও মোনাজাইটের উপস্থিতি রয়েছে।
মুখ্য ভূতত্ত্ববিদ ড. মোহাম্মদ রাজীব যুগান্তরকে বলেন, কক্সবাজার উপকূলের বালুতে ১৯৬০-এর দশকে জিরকনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে বিএইসি বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল এবং কুয়াকাটা এলাকায় মোট ১৭টি ভারী খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল চিহ্নিত করে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে একটি দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি নিজস্ব জরিপে জিরকনসহ অন্য ভারী খনিজের মজুতের পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। কোম্পানিটি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তবে সরকার এতে সাড়া দেয়নি।
কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা : কক্সবাজার খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক এবং ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার জিওলজিক্যাল সায়েন্সেসের পরিচালক ও প্রধান ভূতত্ত্ববিদ ড. মো. গোলাম রসুল যুগান্তরকে বলেন, জিরকনের প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন মজুতের যে হিসাব প্রচলিত রয়েছে, তা পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। ১৯৮৬ সালের পর এ বিষয়ে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ ডিপোজিটভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। ফলে বর্তমানে জিরকনের প্রকৃত মজুত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তার মতে, কক্সবাজার উপকূলে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের জিরকনসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে পাইলট প্রকল্প হিসাবে কক্সবাজারে খনিজ বালু পৃথকীকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর পাঁচ বছর ধরে এ খনিজসম্পদ নিয়ে গবেষণা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার পাইলট প্রকল্পটি বাতিল করে। সে সময় থেকেই খনিজসম্পদের বাণিজ্যিক আহরণ নিয়ে সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরা হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো বাণিজ্যিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ এবং কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখালেও কোনো সরকারই এতে সাড়া দেননি।
বালু আহরণ কেন্দ্রের বেহাল দশা : কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের (বিএসএমইসি) কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। কেন্দ্রটির বিভিন্ন গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির অনেকগুলোই প্রায় অচল। পাশাপাশি জনবল সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রটির পরিচালক শেখ জাফরুল হাসান অনেকটা বিরক্তির সুরে প্রতিবেদককে বলেন, আমি মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন মানুষ। আমাকে এখানে পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০৫ সালের পর থেকে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ঢাকায় যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলুন।
সরেজমিন দেখা যায়, কেন্দ্রটির অধিকাংশ গবেষণাগার ও ল্যাব সরঞ্জাম দীর্ঘদিনের অযত্নে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। ৮০ জনবল কাঠামোর এই কেন্দ্রটিতে বর্তমানে পরিচালক ছাড়া মাত্র একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ান এবং একজন দারোয়ান কর্মরত রয়েছেন।








