বাল্যবিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি কেবল একটি মেয়ের শৈশব ও শিক্ষাজীবনই কেড়ে নেয় না বরং তার স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি সুস্থ, সবল ও বৈষম্যহীন সমাজগঠনে বাল্যবিয়ের অবসান ঘটানো অপরিহার্য। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে এই কু-প্রথা দূরীকরণে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রীমতি সুরোঞ্জনা রানী। একজন সচেতন নাগরিক বা তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে সে স্বপ্ন দেখে বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গঠনের।
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বরেন্দ্র অঞ্চলে বাবুডাইং গ্রামে অবস্থিত প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত বাবুডাইং আলোর পাঠশালার শিক্ষার্থী শ্রীমতি সুরোঞ্জনা রানী। পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষিকাজ, নাচ ও আলপনা আঁকতে বেশ পারদর্শী সুরোঞ্জনা। প্রথম আলো ট্রাস্টের মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানামুখী কর্মকাণ্ড দেখে সে উজ্জীবিত। প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পেয়ে সে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে। তাই সে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহসিকতা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় নিজ গ্রাম হতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পথ অতিক্রম করে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ঝিলিম ইউনিয়নের বিল-বৈলঠা গ্রামের ক্ষুদ্র জাতি নৃ-গোষ্ঠীর কোল সম্প্রদায়ের এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে শ্রীমতি সুরোঞ্জনা রানী। তাঁর বাবার নাম শ্রী সুশীল কোল, মায়ের নাম শ্রীমতি আমিয়া রানী। বড় ভাই শ্রী কাজল কোল। তারা সকলেই অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সে পড়ালেখা করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ ও পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়।
সুরোঞ্জনা বলে, ‘দারিদ্র্য ও অসচেতনতায় অনেক পরিবার কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত, কুসংস্কার, শিক্ষার আলো ও আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় অনেক পরিবার কন্যাসন্তানকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ের ভয়াবহ প্রভাবের ফলে অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার বাড়ে। আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চল বাবুডাইং-সহ দেশের প্রায় সর্বত্রই গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে থাকে। তাই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বাবা-মা বা অভিভাবকদের সঙ্গে সভা বা উঠান বৈঠক করা, বাল্যবিয়ের শারীরিক, মানসিক ও আইনি কুফল সম্পর্কে সচেতন করা, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্য-সচেতনতার আলোচনা, শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া রোধ করা এবং কোথাও বাল্যবিয়ের আয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য তরুণ প্রজন্মকে বাল্যবিয়ের প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।’
বাল্যবিয়ে মুক্ত সমাজগঠন কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। ‘একটি মেয়ে শিক্ষিত হলে একটি পরিবার শিক্ষিত হবে’ এই নীতিকে সামনে রেখে আমাদের সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে এবং বাল্যবিয়ে মুক্ত সমাজ গঠনে সচেষ্ট থাকতে হবে।








