এই বুঝি বাঁশি বাজবে। কিন্তু বাজল না। গ্যালারির হাজারো চোখ থমকে গেল। খেলা থামল না। বল গড়িয়ে গেল। দ্রুত ক্রস, তারপর হেড-গোলের সুযোগ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাঠের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে পৌঁছে গেল বল। এমন দৃশ্য এবারের বিশ্বকাপে নতুন কিছু নয়; এ যেন প্রতিটি ম্যাচের পরিচিত ছবি। নকআউটপর্বে একটি বিষয় স্পষ্ট, এবারের বিশ্বকাপ শুধু নতুন তারকার জন্ম দিচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে ফুটবলের ছন্দও। বাঁশি কম বাজছে, খেলা থামছে কম, বল মাঠে থাকছে বেশি সময়। ফুটবল হয়ে উঠেছে দ্রুততর, আক্রমণাত্মক। এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু খেলোয়াড়দের গতি বা কৌশল নয়; রয়েছে ফিফার রেফারিং দর্শনেরও পরিবর্তন। আর সেটিই এখন বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকদের আলোচনার অন্যতম বিষয়।

একসময় সামান্য ধাক্কা বা কাঁধে কাঁধ লাগলেই রেফারির বাঁশি বেজে উঠত। খেলায় হতো ছন্দপতন। এবারের বিশ্বকাপে উলটো চিত্র। ফিফা দীর্ঘদিন ধরে ম্যাচে অপ্রয়োজনীয় বিরতি কমিয়ে খেলার গতি বাড়ানোর কথা বলে আসছে। সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবারের আসরে। রেফারিদের উৎসাহিত করা হয়েছে তুচ্ছ সংস্পর্শ বা সামান্য ফাউলে খেলা না থামিয়ে ‘প্লে অন’ বা খেলা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে। এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ম্যাচে বলের গতি ব্যাহত হচ্ছে কম, আক্রমণের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে না। দর্শক পাচ্ছে প্রাণবন্ত ফুটবল। ফুটবলের ভাষায় যাকে বলা হয় গেম ফ্লো-অর্থাৎ খেলার স্বাভাবিক প্রবাহ; সেটিই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

পরিসংখ্যানও এই পরিবর্তনের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। ক্রীড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেটএসআই স্পোর্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গড় ফাউলের সংখ্যা নেমে এসেছে ২৪.৩-এ। ২০২২ বিশ্বকাপে এই সংখ্যা ছিল ২৭.৭, ও ২০১৮ আসরে ২৯.৩। হলুদ কার্ডও আগের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে লাল কার্ড কিছুটা বেড়েছে, যদিও এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণের কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন না। আরও একটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। এবারের গ্রুপপর্বে ম্যাচপ্রতি গড়ে ২.৯৫টি গোল হয়েছে-যা আধুনিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ২.৮৩ গোলের রেকর্ড ছিল সর্বোচ্চ। অবশ্য গোল বেড়েছে বলেই যে এর একমাত্র কারণ রেফারিং, তা নয়। উন্নত কৌশল, দ্রুতগতির আক্রমণ, খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখছে।

আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন লুকিয়ে আছে আরেকটি পরিসংখ্যানে। খেলোয়াড়রা আগের তুলনায় খুব বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছেন না। কিন্তু তারা অনেক বেশি গতিতে দৌড়াচ্ছেন। অর্থাৎ, ম্যাচে শক্তির ব্যবহার এখন অনেক বেশি বিস্ফোরণধর্মী। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল কন্ডিশনিং কোচ ক্রিস ওয়েস্টের ভাষায়, ‘এখন আর শুধু আক্রমণের সময় দৌড়ালেই চলে না। বল হারানোর পরও সেটি পুনরুদ্ধারের জন্য একই গতিতে ছুটতে হয়। ফলে আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যকার ব্যবধান প্রায় ঘুচে গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে আধুনিক ‘হাই প্রেস’ ও ‘কাউন্টার প্রেস’ কৌশল। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো গত এক দশকে যে ধরনের ফুটবল খেলেছে, জাতীয় দলগুলোও এখন সেটিকেই বাস্তবতায় রূপ দিচ্ছে।

একসময় বলা হতো, ফুটবল জেতায় প্রতিভা। এখন সেই সমীকরণে আরেকটি শব্দ যোগ হয়েছে-ফিটনেস। বর্তমান ফুটবলে একজন খেলোয়াড়কে শুধু দক্ষ হলেই হয় না; টানা ৯০ মিনিট, প্রয়োজনে ১২০ মিনিট একই তীব্রতায় খেলার সক্ষমতাও অর্জন করতে হয়। এ কারণেই ক্রীড়াবিজ্ঞান, পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞরা এখন যে কোনো দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ম্যাচের পর বরফে ডুবিয়ে রাখা, জিপিএস ডেটা বিশ্লেষণ, ঘুমের সময়সূচি, এমনকি খেলোয়াড়ের শরীরে পানির মাত্রা-সবকিছুই এখন পারফরম্যান্সের অংশ। তবে দ্রুতগতির এই ফুটবলের মূল্যও দিতে হচ্ছে। ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার উচ্চগতিতে স্প্রিন্ট করার ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে হ্যামস্ট্রিং ও কাফের পেশিতে। পুরোপুরি সুস্থ নন বা সদ্য চোট কাটিয়ে ফিরেছেন-এমন খেলোয়াড়দের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। নকআউটপর্বে ম্যাচের চাপ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দল ব্যবস্থাপনা, খেলোয়াড়দের বিশ্রাম এবং রোটেশন অনেক দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফুটবলের এই পরিবর্তন শুধু খেলোয়াড়দের নয়, রেফারিদের ভূমিকাও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখনকার একজন সফল রেফারি শুধু নিয়ম প্রয়োগ করেন না; তিনি বোঝেন কখন খেলা থামানো জরুরি আর কখন খেলার ছন্দ ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অকারণে বাঁশি বাজিয়ে ম্যাচের প্রাণ নষ্ট না করে, আবার প্রয়োজন হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারার মধ্যেই এখন একজন আধুনিক রেফারির সাফল্য।

বিশ্বকাপ কে ট্রফি জিতবে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় খবর। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ সম্ভবত আরেকটি কারণেও মনে থাকবে। এই আসর দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক ফুটবল ধীরে ধীরে নতুন এক ভাষা রপ্ত করছে-যেখানে কম বাঁশি, বেশি গতি; কম বিরতি, বেশি লড়াই; আর প্রতিভার পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান, ফিটনেস ও কৌশল। ফুটবল তার সৌন্দর্য হারায়নি। বরং খেলার ছন্দ বদলে সে যেন আরও দ্রুত, আরও প্রাণবন্ত এবং আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত নতুন এক চ্যাম্পিয়নেরই গল্প বলবে না, বলবে আধুনিক ফুটবলের বদলে যাওয়া এক সময়েরও গল্প।

তথ্যসূত্র : ফিফার রেফারিং সংক্রান্ত তথ্য