‘একটি চলচ্চিত্রে গল্প থাকতেই হবে।’ এই কথা আমরা এতবার শুনেছি যে অনেকেই একে চলচ্চিত্রের মৌলিক শর্ত বলে ধরে নিয়েছেন। আমার কাছে বরং এটি অপরিণত দর্শক-মানসের একটি বালখিল্য আকাঙ্ক্ষা। কারণ, গল্প চলচ্চিত্রের একটি উপাদান হতে পারে, পরিচয় নয়।

১৮৮৮ সালে লুই লে প্রিন্স নির্মাণ করেন রাউন্ডহে গার্ডেন সিন (Roundhay Garden Scene)। পৃথিবীর প্রথম সফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত এই কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যে কোনো গল্প নেই, কোনো চরিত্রের বিকাশ নেই, কোনো নাটকীয় সংঘাতও নেই। আছে কেবল কয়েকজন মানুষের হেঁটে বেড়ানো। অথচ সেই সামান্য দৃশ্যই একটি নতুন শিল্পমাধ্যমের জন্ম দিয়েছিল। সেই জন্মের পর ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছে। সাহিত্য থেকে ধার নিয়েছে, আবার সাহিত্যকে অতিক্রমও করেছে। নাটক, সংগীত, চিত্রকলা, আলোকচিত্র, স্থাপত্য, দর্শন, মনস্তত্ত্ব এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলিয়ে এমন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে, যার ব্যাকরণ অন্য কোনো শিল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার
একটি চলচ্চিত্রকে শুধু গল্প দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং দেখতে হয়, নির্মাতা কী ধরনের অনুভূতি নির্মাণ করতে চেয়েছেন এবং সেই অনুভূতি কতটা সফলভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশে এখনো চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার বড় অংশ আটকে থাকে গল্পে। গল্প কেমন, শেষটা কী হলো, নায়ক কী করল, নায়িকা কাকে পেল। অথচ চলচ্চিত্রের ভাষা গল্পের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একটি দীর্ঘ নীরবতা, একটি স্থির ফ্রেম, আলোছায়ার বিন্যাস, একটি দূরবর্তী শব্দ, কিংবা ক্যামেরার ধীরগতি অনেক সময় একটি সম্পূর্ণ গল্পের চেয়েও গভীর শিল্পানুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।

চলচ্চিত্র মূলত অনুভূতির শিল্প। দর্শক প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে গল্প নয়, অনুভূতি বহন করে নিয়ে যায়। সেই অনুভূতির ভাষা বোঝার জন্য ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের একটি প্রাচীন ধারণা আজও আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক। সেটি হলো নবরস।

ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে শিল্পের মূল রস ৯টি। শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্ত। হাজার বছরের সাহিত্য, নাটক, নৃত্য এবং চিত্রকলার মতো চলচ্চিত্রও এই রসগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বরং চলচ্চিত্রের মতো যৌগিক শিল্পে এগুলো আরও জটিলভাবে পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।

একটি প্রেমের দৃশ্য আসলে শৃঙ্গার রস নির্মাণ করে। একটি ট্র্যাজেডি করুণ রস সৃষ্টি করে। হরর চলচ্চিত্র ভয়ানক রসের ওপর দাঁড়ায়। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি অদ্ভুত রসকে উসকে দেয়। যুদ্ধের দৃশ্য বীর রস তৈরি করে। আবার এমন অনেক চলচ্চিত্র আছে, যা শেষ পর্যন্ত দর্শককে একধরনের নীরব প্রশান্তির মধ্যে পৌঁছে দেয়। সেটিই শান্ত রস।

এ কারণেই একটি চলচ্চিত্রকে শুধু গল্প দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং দেখতে হয়, নির্মাতা কী ধরনের অনুভূতি নির্মাণ করতে চেয়েছেন এবং সেই অনুভূতি কতটা সফলভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছেছে।

জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি এই নবরসেরই এক অনন্য উদাহরণ।

‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার
মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ মূলত শান্ত রসের চলচ্চিত্র। এর ভেতরে করুণ, শৃঙ্গার এবং অদ্ভুত রস থাকলেও শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি দর্শককে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা এবং অস্তিত্বের এক ধ্যানমগ্ন অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। এটি গল্পের চেয়ে অনুভূতির চলচ্চিত্র। মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের দেলুপি আবার করুণ ও বীর রসের এক বাস্তবধর্মী নির্মাণ। সেখানে প্রান্তিক মানুষের বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিরোধের শক্তি। ফলে চলচ্চিত্রটি দর্শককে শুধু কাঁদায় না, দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহসও দেয়।

কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি এক ক্লান্ত পথিককে। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…’। এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু ভৌগোলিক নয়, অস্তিত্বেরও। এখানে করুণ রস ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে। এরপর বনলতা সেনের আবির্ভাবে কবিতা প্রবেশ করে শৃঙ্গার রসে। কিন্তু এই শৃঙ্গার কেবল নারীসৌন্দর্যের নয়, এটি আশ্রয়ের, মানবিকতার, অস্তিত্বের ক্লান্তি থেকে সাময়িক মুক্তির। আর কবিতার শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে সবকিছু মিশে যায় শান্ত রসে। জীবনানন্দের কবিতার সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখানেই। তিনি দুঃখকে দুঃখেই শেষ করেন না, তিনি তাকে প্রশান্তিতে রূপান্তর করেন।

এই নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ মূলত শান্ত রসের চলচ্চিত্র। এর ভেতরে করুণ, শৃঙ্গার এবং অদ্ভুত রস থাকলেও শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি দর্শককে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা এবং অস্তিত্বের এক ধ্যানমগ্ন অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। এটি গল্পের চেয়ে অনুভূতির চলচ্চিত্র।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের দেলুপি আবার করুণ ও বীর রসের এক বাস্তবধর্মী নির্মাণ। সেখানে প্রান্তিক মানুষের বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিরোধের শক্তি। ফলে চলচ্চিত্রটি দর্শককে শুধু কাঁদায় না, দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহসও দেয়।

এই উদাহরণগুলো দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই। চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝার জন্য গল্প যথেষ্ট নয়। গল্প চলচ্চিত্রের একটি অনুষঙ্গমাত্র। যেমন আলো, শব্দ, অভিনয়, সম্পাদনা, রং, কম্পোজিশন কিংবা ক্যামেরার গতি একটি অনুষঙ্গ, গল্পও তেমনি একটি অনুষঙ্গ। কখনো তা কেন্দ্রে থাকে, কখনো থাকে না। কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রাণশক্তি তৈরি হয় এসব উপাদানের সম্মিলিত ক্রিয়ায়।

আমার মনে হয়, আমরা গল্পকে এত বেশি গুরুত্ব দিতে দিতে চলচ্চিত্রকে সাহিত্য দিয়ে বিচার করার অভ্যাসে আটকে গেছি। ফলে যে চলচ্চিত্র অনুভূতি, প্রতীক, নীরবতা কিংবা দৃশ্যভাষার মাধ্যমে কথা বলতে চায়, তাকে আমরা প্রায়ই ‘গল্পহীন’ বলে বাতিল করে দিই।

‘রইদ’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার
মহিনকে যদি শুধু একজন মানুষ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে চরিত্রটি দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু তাকে যদি জীবনানন্দের দ্বিতীয় সত্তা হিসেবে পড়া যায়, তাহলে চলচ্চিত্রটির অনেক স্তর খুলতে শুরু করে। আমার কাছে মহিন সেই মানুষ, যে বাস্তবে নেই, কিন্তু কবির ভেতরে চিরকাল বেঁচে আছে। তিনি জীবনানন্দের নিভৃত আত্মা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, অনন্ত পথচলা এবং অজানার প্রতি এক অন্তহীন টান।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের বনলতা সেন সেই ধরনের একটি চলচ্চিত্র। এটিকে যদি প্রচলিত বায়োপিক বা গল্পনির্ভর সিনেমা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো চোখ এড়িয়ে যাবে। এই চলচ্চিত্রকে পড়তে হবে কবিতার মতো, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যের অর্থ সংলাপে নয়, দৃশ্যের ভেতরের অনুভূতিতে লুকিয়ে থাকে।

এ কারণেই বনলতা সেন নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে রসের প্রসঙ্গটি জরুরি ছিল। কারণ, আমার কাছে এই চলচ্চিত্রের আসল শক্তি গল্পে নয়, তার নির্মিত অনুভূতির জগতে।

এই জায়গা থেকেই বনলতা সেন চলচ্চিত্রের ভেতরে প্রবেশ করা যায়।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের এই চলচ্চিত্রকে আমি প্রচলিত অর্থে বায়োপিক বলতে চাই না। কারণ, এটি জীবনানন্দ দাশের জীবনের ঘটনাপঞ্জি নির্মাণে আগ্রহী নয়। বরং চলচ্চিত্রটি কবির মানসলোক, স্মৃতি, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও অবচেতনের এক সিনেমাটিক রূপ নির্মাণের চেষ্টা করেছে। বাস্তব ও পরাবাস্তব এখানে পাশাপাশি চলে। ইতিহাস, কবিতা ও কল্পনা একে অপরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সেই অর্থে এটি জীবনানন্দকে নিয়ে নির্মিত কোনো তথ্যচিত্র নয়, বরং জীবনানন্দের কাব্যচেতনাকে দৃশ্যের ভাষায় অনুবাদ করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা।

এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক আমার কাছে ‘মহিন’ চরিত্র।

মহিনকে যদি শুধু একজন মানুষ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে চরিত্রটি দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু তাকে যদি জীবনানন্দের দ্বিতীয় সত্তা হিসেবে পড়া যায়, তাহলে চলচ্চিত্রটির অনেক স্তর খুলতে শুরু করে। আমার কাছে মহিন সেই মানুষ, যে বাস্তবে নেই, কিন্তু কবির ভেতরে চিরকাল বেঁচে আছে। তিনি জীবনানন্দের নিভৃত আত্মা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, অনন্ত পথচলা এবং অজানার প্রতি এক অন্তহীন টান।

সাহিত্যে এমন চরিত্র নতুন নয়। মহাভারতের কৃষ্ণের বর্তমান রূপ এক দিনে তৈরি হয়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরাণ, লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণের ভেতর দিয়ে চরিত্রটি আজকের অবস্থায় এসেছে। একইভাবে হোমারের ইলিয়াড, গিলগামেশ মহাকাব্য কিংবা আর্থারিয়ান কিংবদন্তির নায়কেরাও একাধিক সময়ের কল্পনার স্তর বহন করে। তাদের বাস্তব অস্তিত্বের চেয়ে সাহিত্যিক অস্তিত্বই বড় হয়ে ওঠে।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত ধারাবাহিকভাবে পেইন্টিং-প্রভাবিত ফ্রেম আমি খুব কমই দেখেছি। প্রতিটি দৃশ্যে আলো ও অন্ধকারের বিন্যাস, রঙের সংযম, স্থাপত্যের ব্যবহার, পোশাক, লোকজ উপাদান এবং ফ্রেমের গভীরতা মিলে এমন এক নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে, যা আমাদের চলচ্চিত্রে বিরল। অনেক দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, যেন কোনো ধ্রুপদি ক্যানভাস ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছে।

মহিন চরিত্রটিও আমার কাছে সেই ধরনের একটি সাহিত্যিক নির্মাণ। তিনি জীবনানন্দ নন, আবার জীবনানন্দ ছাড়া তার অস্তিত্বও নেই। তিনি কবির ‘আমি’ এবং ‘অন্য আমি’র মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতীকী সত্তা। এই ধারণাটিই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

কিন্তু এখানে এসেই চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটিও চোখে পড়ে। চলচ্চিত্রটি তার দর্শকের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেনি।

যে দর্শকের জন্য এত প্রতীক, এত রূপক, এত পরাবাস্তব নির্মাণ, সেই দর্শককেই আবার সংলাপের মাধ্যমে বারবার বলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কী বুঝতে হবে। বিশেষ করে মহিনের মুখে বারবার উচ্চারিত, ‘আমি এখনো জন্মাইনি’, কিংবা অনুরূপ ব্যাখ্যামূলক সংলাপগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়েছে, যেন চিত্রনাট্য নিজেই নিজের টীকা লিখছে।’

কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে কখনো নিজেকে ব্যাখ্যা করে না। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও আমি একই কথা বিশ্বাস করি।

একজন নির্মাতা যখন দর্শকের ওপর ভরসা করেন, তখন নীরবতাও কথা বলে। একটি অসম্পূর্ণ দৃশ্য, একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন কিংবা একটি প্রতীক অনেক সময় দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করে। বনলতা সেন ঠিক সেই জায়গায় আরও সাহসী হতে পারত।

বরং আমার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটি আরও অনেক নীরবতা দাবি করছিল।

এমন অসংখ্য দৃশ্য আছে, যেখানে সংলাপের বদলে শুধু মুখের অভিব্যক্তি, আলো, বাতাসের শব্দ কিংবা ক্যামেরার স্থিরতা যথেষ্ট ছিল। যখন সংলাপ কেবল তথ্য বহন করে, তখন তা চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষাকে দুর্বল করে দেয়। কারণ, চলচ্চিত্রের শক্তি তথ্যে নয়, অনুভূতিতে।

এই ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভিজ্যুয়াল নির্মাণ।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত ধারাবাহিকভাবে পেইন্টিং-প্রভাবিত ফ্রেম আমি খুব কমই দেখেছি। প্রতিটি দৃশ্যে আলো ও অন্ধকারের বিন্যাস, রঙের সংযম, স্থাপত্যের ব্যবহার, পোশাক, লোকজ উপাদান এবং ফ্রেমের গভীরতা মিলে এমন এক নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে, যা আমাদের চলচ্চিত্রে বিরল। অনেক দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, যেন কোনো ধ্রুপদি ক্যানভাস ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছে।

এই চলচ্চিত্রে দৃশ্যগুলো কেবল গল্প বলে না, তারা নিজেরাও অর্থ তৈরি করে।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর একটি কোলাজ
বনলতা সেন চলচ্চিত্রের আরেকটি জায়গায় এসে আমার আপত্তি তৈরি হয়, সেটি নারী চরিত্রের নির্মাণে। চলচ্চিত্রটি যেহেতু একজন পুরুষ কবির মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত, তাই নারী চরিত্রগুলো তার দৃষ্টির মধ্য দিয়েই আমাদের সামনে আসে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দৃষ্টিই যখন একমাত্র দৃষ্টি হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। বনলতা, লাবণ্য কিংবা অন্য নারী চরিত্রগুলো অনেক সময় যেন নিজস্ব অভিজ্ঞতার মানুষ নয়, তারা পুরুষ চরিত্রের মানসিক যাত্রার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

একটি খালি ঘর, একটি জানালা, কুয়াশাঢাকা পথ, নদীর তীর কিংবা দীর্ঘ করিডরও এখানে চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এটাই চলচ্চিত্রের প্রকৃত ভাষা। কারণ, চরিত্র মানেই কেবল রক্তমাংসের মানুষ নয়। একটি প্রপস, একটি গাছ, একটি পশু, একটি আলোর রেখা, এমনকি একটি শব্দও চরিত্র হয়ে উঠতে পারে, যদি তা দর্শকের অনুভূতিকে বহন করে।

তবে এই অসাধারণ ভিজ্যুয়াল ধারাবাহিকতার মধ্যেও একটি বিষয় আমাকে বারবার বিচলিত করেছে।

অনেক দৃশ্যের শুরুতেই ট্রলি ট্র্যাকিং শটের পুনরাবৃত্তি।

আমি ট্রলি ট্র্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে নই। বরং এটি চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা। কিন্তু প্রতিটি ভাষারই একটি ছন্দ আছে। একটি শব্দ বারবার উচ্চারণ করলে যেমন তার অভিঘাত কমে যায়, তেমনি একটি ক্যামেরা মুভমেন্টও অতিরিক্ত ব্যবহারে নিজের শক্তি হারায়।

কবিতার একটি মাত্রা ভুল হলে যেমন পাঠক ছন্দপতন অনুভব করেন, এই চলচ্চিত্রেও বারবার একই ধরনের ট্রলি শট আমাকে সেই অনুভূতিই দিয়েছে। প্রতিটি দৃশ্য আলাদা অনুভূতি তৈরি করতে চাইছে, অথচ একই ধরনের প্রবেশভঙ্গি তাদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় এক পুনরাবৃত্তি সৃষ্টি করেছে।

তারপরও এই ছবির ভিজ্যুয়াল কল্পনা এত সমৃদ্ধ যে এই সীমাবদ্ধতা তার সামগ্রিক শিল্পমূল্যকে নষ্ট করতে পারেনি। বরং বারবার মনে হয়েছে, পরিচালক যদি সংলাপের পরিবর্তে দৃশ্যের ওপর আরও বেশি ভরসা করতেন, তাহলে বনলতা সেন শুধু একটি সুন্দর চলচ্চিত্রই নয়, আরও অনেক বেশি রহস্যময়, আরও দীর্ঘস্থায়ী এক চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারত।

বনলতা সেন চলচ্চিত্রের আরেকটি জায়গায় এসে আমার আপত্তি তৈরি হয়, সেটি নারী চরিত্রের নির্মাণে।

চলচ্চিত্রটি যেহেতু একজন পুরুষ কবির মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত, তাই নারী চরিত্রগুলো তার দৃষ্টির মধ্য দিয়েই আমাদের সামনে আসে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দৃষ্টিই যখন একমাত্র দৃষ্টি হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। বনলতা, লাবণ্য কিংবা অন্য নারী চরিত্রগুলো অনেক সময় যেন নিজস্ব অভিজ্ঞতার মানুষ নয়, তারা পুরুষ চরিত্রের মানসিক যাত্রার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
একটি চরিত্র তখনই সফল হয়, যখন তার অনুভূতি দর্শকের অনুভূতিতে রূপান্তরিত হয়। তার আনন্দ আমার আনন্দ হয়ে ওঠে, তার ক্ষতি আমার ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়। বনলতা সেন-এর মানবচরিত্রগুলো সব সময় সেই গভীর সংযোগ তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ছবির অন্য উপাদানগুলো সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করে দেয়।

কয়েকটি দৃশ্যে মনে হয়েছে, নারী যেন খুব সহজেই পুরুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ায়, যেন তার নিজের কোনো দ্বিধা, দূরত্ব বা স্বাধীন মানসিক জগৎ নেই। অথচ জীবনানন্দের সাহিত্য পড়লে আমরা জানি, নারীর উপস্থিতি সেখানে কখনোই এত সরল নয়। তিনি নারীকে যেমন আকাঙ্ক্ষা করেছেন, তেমনি তাকে অধরাও রেখেছেন। সেই জটিলতা চলচ্চিত্রে সব সময় ধরা পড়েনি।

লাবণ্য দাশের চরিত্রও আরও গভীর হওয়ার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে জীবনানন্দের চাকরি হারানোর সংবাদে তার আবেগের প্রকাশ দৃশ্যটিতে আমি কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেছি। মুহূর্তটি যেন চরিত্রের ভেতর থেকে নয়, নাটকীয়তার প্রয়োজন থেকে নির্মিত। বাস্তব মানুষ প্রায়ই তাদের বেদনা এত সরাসরি প্রকাশ করেন না। অনেক সময় নীরবতাই কান্নার চেয়ে বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।

কুসুমকুমারী দাশের উপস্থিতি নিয়েও আমার প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কবি এবং জীবনানন্দের মানসগঠনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু চলচ্চিত্রে তার উপস্থিতি মূল আবেগপ্রবাহকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যায়, সেটি স্পষ্ট হয় না। কয়েকটি দৃশ্য যেন আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত, কিন্তু পুরো চলচ্চিত্রের রসপ্রবাহের সঙ্গে তাদের সংযোগ দৃঢ় নয়। একটি চরিত্র কেবল ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে চলচ্চিত্রে থাকবে, নাকি চলচ্চিত্রের অন্তর্গত আবেগ ও অর্থকে বহন করবে, এই প্রশ্নটি এখানে থেকেই যায়।

রসতত্ত্বের আলোকে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।

একটি চরিত্র তখনই সফল হয়, যখন তার অনুভূতি দর্শকের অনুভূতিতে রূপান্তরিত হয়। তার আনন্দ আমার আনন্দ হয়ে ওঠে, তার ক্ষতি আমার ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়। বনলতা সেন-এর মানবচরিত্রগুলো সব সময় সেই গভীর সংযোগ তৈরি করতে পারেনি।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ছবির অন্য উপাদানগুলো সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করে দেয়।

যেমনটা আগেই বলেছি, চলচ্চিত্রে চরিত্র মানেই মানুষ নয়। একটি নদী চরিত্র হতে পারে। একটি জানালা, একটি খালি চেয়ার, একটি পুরোনো ট্রাঙ্ক, একটি পাখির ডাক কিংবা বৃষ্টির শব্দও চরিত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ, চলচ্চিত্র মূলত উপস্থিতির শিল্প।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও একটি সচেতন শৈলী লক্ষ করেছি। অধিকাংশ অভিনয়ে মঞ্চাভিনয়ের ছাপ স্পষ্ট। যদি এটি পরিচালকের নান্দনিক সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে অভিনেতারা সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করেছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের ক্যামেরা মানুষের মুখের খুব কাছে যায়। সেখানে অনেক সময় ক্ষুদ্রতম অভিব্যক্তিও একটি দীর্ঘ সংলাপের সমান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়েছে, কিছু কিছু দৃশ্যে অভিনয় আরও সংযত হলে চলচ্চিত্রের আবেগ আরও গভীর হতে পারত।

বনলতা সেন এই জায়গাতেই আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে।

এখানে আলো চরিত্র হয়ে ওঠে। কুয়াশা ও নীরবতা চরিত্র হয়ে ওঠে। স্থাপত্য, পোশাক, লোকজ উপকরণ, রং, আবহসংগীত এবং ফ্রেমের গভীরতা মিলিয়ে একধরনের অনুভূতির ভূগোল তৈরি হয়। এই ভূগোলেই চলচ্চিত্রটি তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত বড় পরিসরে পরাবাস্তব দৃশ্য নির্মাণের প্রচেষ্টা খুব কম দেখা গেছে। প্রোডাকশন ডিজাইন, শিল্পনির্দেশনা এবং দৃশ্য বিন্যাসে এই ছবির উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। অনেক দৃশ্য মনে হয়েছে যেন কোনো ধ্রুপদি চিত্রকর্মের পুনর্নির্মাণ, কিন্তু নিছক অনুকরণ নয়, বরং চলচ্চিত্রের নিজস্ব সময় ও গতির ভেতর নতুন করে জন্ম নেওয়া এক ভিজ্যুয়াল কবিতা।

বিশেষভাবে শিল্পনির্দেশক এবং প্রোডাকশন ডিজাইনারের কাজের প্রশংসা করতেই হয়। তাঁদের শ্রম এই চলচ্চিত্রকে শুধু সুন্দর করেনি, একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক পরিচয়ও দিয়েছে। তবে মহিনের ট্রামযাত্রাসহ কয়েকটি দৃশ্যে কম্পিউটার গ্রাফিকস আরও পরিশীলিত হলে সেই ভিজ্যুয়াল জগৎ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারত।

অভিনয়ের ক্ষেত্রেও একটি সচেতন শৈলী লক্ষ করেছি। অধিকাংশ অভিনয়ে মঞ্চাভিনয়ের ছাপ স্পষ্ট। যদি এটি পরিচালকের নান্দনিক সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে অভিনেতারা সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করেছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের ক্যামেরা মানুষের মুখের খুব কাছে যায়। সেখানে অনেক সময় ক্ষুদ্রতম অভিব্যক্তিও একটি দীর্ঘ সংলাপের সমান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়েছে, কিছু কিছু দৃশ্যে অভিনয় আরও সংযত হলে চলচ্চিত্রের আবেগ আরও গভীর হতে পারত।

তবে এই ছবির শব্দ নির্মাণ নিয়ে আলাদা করে বলতে হয়।

শব্দ, নীরবতা, আবহসংগীত এবং আলোর ব্যবহারে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল। এখানে শব্দ কেবল শোনার নয়, অনুভব করার বিষয়। এই নির্মাণই ছবিটিকে অনেক সময় দৃশ্যের চেয়েও বেশি স্মরণীয় করে তোলে।

সবশেষে একটি কথাই বলতে চাই।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার ও দুটি দৃশ্যের কোলাজ
আমাদের দর্শক যদি গল্পের প্রত্যাশা থেকে একটু সরে এসে চলচ্চিত্রকে তার নিজস্ব ভাষায় পড়তে শেখে, তাহলে বনলতা সেন-এর মতো চলচ্চিত্র নিয়ে বিতর্কও বদলাবে। তখন প্রশ্ন হবে না, ‘গল্প কোথায়?’ প্রশ্ন হবে, ‘চলচ্চিত্রটি আমাকে কী অনুভব করাল?’ আমি বিশ্বাস করি, সেই দিনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি আরেক ধাপ পরিণত হবে।

আমি বনলতা সেনকে নিখুঁত চলচ্চিত্র বলব না। এর সংলাপ আরও সংযত হতে পারত। কিছু চরিত্র আরও গভীর হতে পারত। কিছু দৃশ্য আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত। কিন্তু শিল্পের মূল্যায়ন কখনোই কেবল তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে হয় না, হয় তার সাহস দিয়েও।

যে সময়ে আমাদের অধিকাংশ চলচ্চিত্র নিরাপদ গল্প বলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময় ‘বনলতা সেন’ কবিতাকে চলচ্চিত্রে অনুবাদ করার ঝুঁকি নিয়েছে। জীবনানন্দের জীবনী নয়, তার অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছে কি না, সে নিয়ে বিতর্ক থাকবে। থাকাই উচিত। কারণ, বিতর্কহীন শিল্প সাধারণত দীর্ঘজীবী হয় না।

আমার কাছে বনলতা সেন–এর সবচেয়ে বড় অর্জন অন্যত্র। এই চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়। সিনেমা অনুভূতি নির্মাণের শিল্প। একটি দৃশ্য, একটি আলো, একটি দীর্ঘ নীরবতা কিংবা একটি মুখের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকা ক্যামেরাও এমন এক রস সৃষ্টি করতে পারে, যা শত সংলাপেও সম্ভব নয়।

হয়তো এ কারণেই চলচ্চিত্রটি শেষ হওয়ার পরও তার অনেক দৃশ্য মনে থেকে যায়, অথচ তার কাহিনি নয়। একটি চলচ্চিত্রের জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?

আমাদের দর্শক যদি গল্পের প্রত্যাশা থেকে একটু সরে এসে চলচ্চিত্রকে তার নিজস্ব ভাষায় পড়তে শেখে, তাহলে বনলতা সেন-এর মতো চলচ্চিত্র নিয়ে বিতর্কও বদলাবে। তখন প্রশ্ন হবে না, ‘গল্প কোথায়?’ প্রশ্ন হবে, ‘চলচ্চিত্রটি আমাকে কী অনুভব করাল?’

আমি বিশ্বাস করি, সেই দিনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি আরেক ধাপ পরিণত হবে।

  • খন্দকার সুমন: লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা