চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন ও সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁরা বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক বন খণ্ডিত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাতির চলাচলের করিডর ও জীববৈচিত্র্য। তাই অবিলম্বে এসব উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানান তাঁরা।

আজ সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় নগরের চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব দাবি জানানো হয়। চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী, অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ‘হাতির করিডর বাঁচান, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করুন’, ‘সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ এখনই বন্ধ করতে হবে’, ‘হাতির পথ অবরোধ নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান’, ‘রাস্তা হবে পরিকল্পিত, হাতির পথ রবে রক্ষিত’ এবং ‘উন্নয়ন চাই, কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়’—এমন বিভিন্ন লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন।

কর্মসূচিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান বলেন, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বন বিভাগ অনেক সময় ক্ষমতাবানদের চাপে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। তাই সবাইকে একসঙ্গে বন রক্ষার আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব আবদুল আলীম বলেন, ‘আমরা শুধু পরিবেশ বা হাতির জন্য নয়, মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও দাঁড়িয়েছি। কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা এমন প্রশাসন চাই, যারা মানুষ, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।’

পরিবেশকর্মী রিতু পারভি বলেন, চকরিয়ার খুঁটাখালীর মধুশিয়া গর্জনবনের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বন এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর। একইভাবে সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতরেও দুটি সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। অথচ চলতি বছর প্রণীত ‘বৃক্ষ ও বন সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ ’-এ প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ বন্য প্রাণীর আবাসস্থলকে খণ্ডিত করবে এবং মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়াবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বক্তারা আরও বলেন, চকরিয়ার খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া হাতির করিডরের ওপর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর ক্ষতি এড়াতে বিকল্প পথে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন সিআরবি রক্ষা মঞ্চের সংগঠক সোহাইল উদদৌজা, পরিবেশকর্মী মঞ্জুরুল করিম বিপ্লব, স্বপ্নবাগিচা বিদ্যানিকেতনের সংগঠক জাহেদুল আলম, পিটাছড়া বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল, পরিবেশকর্মী মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, স্বপ্ননগর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজা আল মামুনসহ অন্যরা। তাঁরা বলেন, উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে, তবে প্রাকৃতিক বন ও হাতির চলাচলের করিডর ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সাতকানিয়ায় বন কেটে সড়ক

মানববন্ধন থেকে পাঁচটি দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল, হাতির করিডরকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া, নিরপেক্ষ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করা, বন ধ্বংস না করে বিকল্প পথ নির্ধারণ এবং সাতকানিয়ার বৈতরণি, চকরিয়া ও কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ। কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন অগ্নিবীণা পাঠাগারের সংগঠক সানি চৌধুরী।

উল্লেখ্য, ১৮ জুন প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘সাতকানিয়ায় বন কেটে সড়ক’ ও ২৫ জুন প্রথম পাতায় ‘হাতির চলার পথে হবে পাকা সড়ক’ শিরোনামের দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

হাতির চলার পথে হবে পাকা সড়ক