বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারি বৃষ্টিতে দেশের অনেক জায়গায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া ঝড়ের কবলে পড়ে বঙ্গোপসাগরে একটি ফিশিং ট্রলার ডুবে যায়। এতে ৬ জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ২০৬ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বান্দরবানে পাহাড়ধস এবং লামা-আলীকদম সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। থানচিতে আটকা পড়েছে শতাধিক পর্যটক। এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময় দমকা হাওয়া, বজ পাত এবং তাপমাত্রা সামান্য কমার সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড ও তৎসংলগ্ন ওড়িশা এলাকায় স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার থেকে মঙ্গলবার খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের অনেক স্থানে বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বুধবার রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের অনেক স্থানেও বৃষ্টি হতে পারে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার এবং শুক্রবার থেকে শনিবারও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বজ সহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বঙ্গোপসাগরে ফিশিং ট্রলারডুবি, ৬ জেলে নিখোঁজ, উদ্ধার ৫ : বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে পটুয়াখালীর গলাচিপার ১১ জেলেসহ ফিশিং ট্রলার ডুবে যায়। পরে ৫ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও অপর ৬ জেলে এখনও নিখোঁজ। রোববার রাত ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। রাতেই উদ্ধার হওয়া ৫ জেলেকে গলাচিপায় নিয়ে আসা হয়। সোমবার দুপুরের দিকে উদ্ধার হওয়া জেলেরা সাগরে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার পর গলাচিপা থানায় খবরটি জানান বলে নিশ্চিত করেছেন অফিসার ইনচার্জ মো. ইমতিয়াজ আহমেদ। উদ্ধার হওয়া জেলেদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক।
চট্টগ্রামে টানা বর্ষণ : নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২০৬ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত নগরীর জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোয় দফায়-দফায় পরিদর্শন ও তদারকি করেছেন। এই সময়ে নগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে অল্প সময়ের জন্য পানি জমলেও কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। রোববার ভোর থেকে বৃষ্টি শুরুর পর নগরীতে জলাবদ্ধতা তৈরি না হওয়ার পেছনে চসিক ও চউক কর্মকর্তাদের তৎপরতাকে বড় কারণ হিসাবে দেখছেন নগরবাসী।
এদিকে আবহাওয়া অফিস থেকে পাহাড়ধসের আশঙ্কা জানানোর পর রোববার রাত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের কেউ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে মুক্ত রাখতে আমাদের পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন।
বান্দরবানে পাহাড়ধস, লামা-আলীকদম সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন : টানা ভারি বৃষ্টিপাতে বান্দরবানে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় লামা-আলীকদম সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের কারণে রুমা-বগালেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় থানচি উপজেলার তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুমে ভ্রমণে পর্যটকদের সাময়িকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সোমবার সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা জানায়, রোববার থেকে শুরু হওয়া টানা ভারি বৃষ্টিতে লামা-আলীকদম সড়কের বিভিন্ন স্থানে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে রুমা উপজেলার পেঁপেবাগান এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় রুমা-বগালেক সড়কেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কুহালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মংপু মারমা ও টংকাবতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মায়ং ম্রো প্রদীপ জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী বলেন, রোববার থেকে চলমান ভারী বৃষ্টির কারণে রুমা-বগালেক সড়কের মধ্যবর্তী অংশে পাহাড়ধস হয়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, আলীকদম-লামা সড়কের রেপারপাড়ি এলাকায় সড়কের ওপর কোমরসমান পানি রয়েছে। কয়েকজন মোটরসাইকেল আরোহী ও পর্যটক আটকা পড়েছেন। নৌকার মাধ্যমে তাদের পার করার চেষ্টা চলছে। তবে সাধারণ যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে টানা দুই দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলার নদী ও পাহাড়ি ছড়ার পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। নদীর তীরবর্তী বসতঘর এবং শত শত একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
থানচিতে আটকা পড়েছে শতাধিক পর্যটক : টানা বর্ষণে সাঙ্গু নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বান্দরবানের থানচিতে ভ্রমণকারী পর্যটকদের তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুম এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বৈরী পরিস্থিতিতে রেমাক্রী-তীন্দু এলাকায় শতাধিক ভ্রমণকারী পর্যটক আটকা পড়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল।








