‘জ্ঞান অর্জনের জন্য চীন দেশে যাও’ উক্তিটি একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ। জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বোঝাতে রূপক অর্থে বাক্যটি ব্যবহার করা হয়। একসময় চীনের মানুষকে আফিমে বুঁদ করে রেখেছিল ইংরেজ বণিকরা। তারপর অনেক লড়াই, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশটি উঠে দাঁড়িয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে।
ইতোমধ্যে চীন বিপ্লব ৭৭ বছরে পড়েছে। দেশটিকে আর চেনা যায় না। শিল্পোন্নয়নে ইউরোপ যেটি অর্জন করেছে ৩০০ বছরে, চীন সেটি করে দেখিয়েছে ৫০ বছরে। ১৯৫০-এর দশকে চীনের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি দেশটিকে আমূল বদলে দিয়েছে। জাতীয় আয়ের হিসাবে চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিধর দেশ। চীনের দেড় বিলিয়ন মানুষ এখন আক্ষরিক অর্থেই জনশক্তি। তার সঙ্গে ঘটেছে আধুনিক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির মেলবন্ধন। চীনের অর্থনীতি বাণিজ্যিক উদ্বৃত্তে টইটম্বুর। সে বিনিয়োগের পথ খুঁজছে। বাংলাদেশের মতো একটি পশ্চাৎপদ অর্থনীতির দেশের কাছে চীন হতে পারে একটি উদাহরণ এবং একই সঙ্গে উন্নয়নের সহায়ক।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ঘুরে এলেন। চীনের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তার দেখা ও কথা হয়েছে। চীনের সঙ্গে এ যোগাযোগকে পর্যবেক্ষকরা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে দেখছেন।
চীনের সঙ্গে আমাদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ৭০ বছরে পড়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্টবিরোধী দুটি আঞ্চলিক উদ্যোগ-সিয়াটো আর বাগদাদ প্যাক্ট-এ যোগ দিয়েছিল পাকিস্তান। কমিউনিস্ট জুজুর ভয়ে সিয়াটো গড়ে তোলা হয়েছিল চীনকে ঘিরে। এ অবস্থায় চীনের সঙ্গে জানালা খুলে দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৬ সালের অক্টোবরে তিনি চীন সফরে যান। একই বছর ডিসেম্বরে ফিরতি সফরে আসেন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই। সেই থেকে শুরু পাক-চীন মৈত্রীর ইতিহাস।
১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে চীন অবস্থান নেয় পাকিস্তানের পক্ষে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির গর্তে ঢুকে যায়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার আবেদন জানালে চীন বাধা দেয়। চীন বলেছিল, যতদিন ভারতে আটক পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দিরা নিজ দেশে ফিরে না যাবে, চীন ততদিন জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সমর্থন করবে না। হয়েছিলও তাই। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেওয়া হলে ওই বছর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয়। চীন আর বাধা দেয়নি। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের শুরুও ওই সময়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি ওই সময় পিকিং (এখন নাম বেইজিং) সফর করেন। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি আসে ১৯৭৫ সালের আগস্টে।
চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ আবার শুরু হয় ১৯৭৭ সালে, যখন তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান বেইজিং সফরে যান। তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই। জিয়াউর রহমানকে সরকারপ্রধানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশের একাধিক সরকারপ্রধান চীন সফর করেছেন। এ দেশে এসেছেন চীনের নেতারা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে সেখানে গেছেন এ দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পারদ সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী।
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। আবার চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঘাটতিও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশের পাশে আছে ভারতের মতো একটি বড় দেশ। ইতিহাসের লিগ্যাসি থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ওঠানামা করেছে। কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অতিরিক্ত ভারতঘেঁষা নীতি চীনের বিরক্তি উৎপাদন করেছিল। শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের শেষ পর্যায়ে এসে তার লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে হাসিনা সরকার আর নেই। মাঝখানে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ছিল দুবছর। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, যা দেশের বৈধ প্রতিনিধি। আশা করা যায়, এ সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। এ পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।
আমাদের দেশ থেকে যখনই কোনো সরকারপ্রধান বিদেশে গেছেন, সরকারি মুখপাত্ররা দাবি করেছেন-এটি সফল সফর। আজ অবধি কেউ বলেননি, তার সফর ব্যর্থ হয়েছিল। সাফল্য আর ব্যর্থতা প্রচারে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় সফর-পরবর্তী কর্মকাণ্ডে। এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন ধাপে উন্নীত হবে। দুই দেশের জনগণের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বার্থে অংশীদারত্বের পাশাপাশি আলোচিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং। চীন সফরের শেষ দিনে তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্বে যে কোনো পরিবর্তনই আসুক না কেন, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু,’ ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসাবেই থাকবে। দুই শীর্ষ নেতা প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একান্তেও কথা বলেন। তাদের ‘একান্ত’ কথাবার্তার হদিস আমরা হয়তো কখনো জানব না, যদি না তারা নিজেরা তা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার প্রচার করা হয়েছে। যৌথ ইশতেহারে বলা হয়েছে, দুপক্ষ পারস্পরিক সম্পর্ক পরের ধাপে নিয়ে যেতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দুপক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের একটি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়। পাশাপাশি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সংলাপের প্রক্রিয়া চালু করা যায় কি না, সে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে রাজি হয়েছে।
তারেক রহমানের এ সফরে চীনের সঙ্গে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। কোনো চুক্তি হয়নি। অবশ্য চুক্তির জন্য যে পরিমাণ ‘হোমওয়ার্ক’ দরকার, বাংলাদেশের তা ছিল না। এজন্য সময় দিতে হবে। চীনের সঙ্গে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ কোন মাত্রায় পৌঁছাবে এবং কর্মক্ষেত্রে কোন কোন প্রকল্পের মাধ্যমে তার প্রতিফলন দেখা যাবে, সেটি বুঝতে হলে আরও অপেক্ষা করতে হবে। চীন তো ভূমিকা রাখার জন্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে তৈরি। আমাদের কতটুকু প্রস্তুতি আছে, তা ভেবে দেখার বিষয়।
যোগাযোগ ও অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে চীন। তারা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করারও আগ্রহ দেখিয়েছে। করিডরের সঙ্গে বন্দর উন্নয়নের বিষয়টি জড়িত। বলা হচ্ছে, এ করিডর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের ধারণাটি পুরোনো। ১৯৯০-এর দশকে ‘বিসিআইএম’ নামের বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ওই সময় ও তারপর এ দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে; কিন্তু বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ভারতের ভূরাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে বিসিআইএম করিডরের উদ্যোগটি আর এগোয়নি বলে জানা যায়। এসব কথা তো কোনো সরকার বিবৃতি দিয়ে প্রকাশ করে না।
এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান ‘চীন-মিয়ানমার’ ইকোনমিক করিডর সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। তবে ভারতকে উপেক্ষা করে বা পাশ কাটিয়ে চীনের এ উদ্যোগে শামিল হওয়ার ইচ্ছা বা সাহস দেখাতে এবং ঝুঁকি নিতে পারেনি শেখ হাসিনার সরকার। এখন দেখা যাক, বর্তমান বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে কী ভূমিকা নেয়।
এ ব্যাপারে একটা বিষয় বিবেচনা করে দেখা খুবই দরকার। চীন তার জাতীয় ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে কখনো পা দেয় না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো দেশ দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। চীনও এর ব্যতিক্রম নয়। সে দেখে লাভ। বাংলাদেশকেও তার লাভ ভেবে দেখতে হবে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখে এ লাভের ব্যাপারে বাংলাদেশের উচিত বুঝেশুনে এগোনো। এ অঞ্চল ও বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা যায়, তার সক্ষমতা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। দেখা যাক, আমরা অক্ষমতার এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি কি না।
অনেকদিন ধরেই আলোচনায় আছে তিস্তা প্রকল্প এবং এ প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ। এ নিয়ে আছে ভারতের অস্বস্তি। প্রকল্পের স্থান ভারতের ‘চিকেন নেক’-এর কাছে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক মন্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, তিস্তা প্রকল্প হবে চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘লিটমাস টেস্ট’। এ ধরনের ইস্যু, যেখানে দুটি দেশের পালটাপালটি স্বার্থ আছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। এখানে স্বার্থগুলো এলে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, যদি কোনো একটা ইস্যুতে বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটা নিয়ে সমালোচনা কম হবে। মোদ্দা কথা, বড় ধরনের কোনো প্রকল্প নিয়ে দেশের মধ্যে ঐকমত্য থাকতে হবে। এটি হবে দেশের প্রকল্প, দেশের মানুষের জন্য, কোনো ‘দলীয় প্রকল্প’ হবে না।
পাদটীকা
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন ঢাকায় ফিরে বলেছেন, ‘আমরা অভিভূত হয়েছি, যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছে, লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছে-এটি শুধু প্রধানমন্ত্রী না, বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল গৌরবের বিষয়’ (যুগান্তর অনলাইন, ২৬ জুন)।
এ দেশের গণমাধ্যমে এ ধরনের সংবাদ নিয়মিত দেখি- বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা, ১৯ বা ২১ বার তোপধ্বনি ইত্যাদি। বিশ্বের সব দেশেই সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে লাল রঙের ম্যাট বিছিয়ে দেওয়া হয়। অনেক বিমানবন্দরে প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্যও লাল রঙের ম্যাট থাকে। এটি একটা রীতি। এর কোনো সংবাদমূল্য নেই।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক








