দুর্নীতি আমাদের সমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। সরকারি অফিস, ভূমি কার্যালয়, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য-জীবনের নানা ক্ষেত্রে এর উপস্থিতি নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগের ধরন বদলেছে। এখন প্রশ্ন শুধু দুর্নীতি আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র ও সমাজ কি সত্যিই এই দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আবার আশাবাদী হওয়ার কারণও একেবারে নেই, তা নয়। সর্বশেষ দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৪ এবং অবস্থান ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম। অর্থাৎ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সরকারি ক্রয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দুর্নীতি দমনের প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ফলে আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কি দুর্নীতিকে বাংলাদেশের স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেব, নাকি এটিকে পরিবর্তনের চেষ্টা করব?
আসলে দুর্নীতি কেবল নৈতিকতার সমস্যা নয়। এটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও। একজন নাগরিক যখন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মনে করেন যে নিয়ম মেনে কাজ করলে সময় বেশি লাগবে, অথচ অনৈতিক পথে গেলে দ্রুত কাজ হবে, তখন দুর্নীতি তার কাছে আর ব্যতিক্রম থাকে না। হয়ে ওঠে বাস্তবতার অংশ।
এই জায়গায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন, সংসদ, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করে, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত হয়। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দুর্নীতি শুধু টিকে থাকে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একক কমিশন, সরকার বা আইন নয়—একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। আমরা যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে আজকের হতাশা একদিন পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হতে পারে
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধা, গবেষণা ও যোগ্যতার পাশাপাশি যদি রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার নৈকট্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায় যে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যদি মেধার পরিবর্তে আনুগত্য পুরস্কৃত হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের দক্ষতা যেমন কমে, তেমনি দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মানুষের শেষ আশ্রয় হওয়া উচিত আদালত। একজন নাগরিকের বিশ্বাস থাকতে হবে যে ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য আইনের প্রয়োগ একই। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষেত্রেও আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি। একটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে শুধু নতুন নেতৃত্ব বা নতুন আইন যথেষ্ট নয়। তদন্তের স্বাধীনতা, পেশাদার দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত বিচার—সবকিছু মিলিয়েই একটি কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা তৈরি হয়। বড় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয়, অবস্থান বা রাজনৈতিক প্রভাব যা-ই হোক না কেন, আইনের প্রয়োগ যদি সমান না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে না।
এখানে প্রযুক্তি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারি ক্রয়, কর প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সেবাকে যত বেশি ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর করা যাবে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা তত কমবে। ই-প্রকিউরমেন্ট, অনলাইন সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং তথ্যের উন্মুক্ততা দুর্নীতির অনেক প্রচলিত সুযোগ কমাতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি কোনো জাদুর কাঠি নয়। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন আইন, বিধি ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে ডিজিটাল ব্যবস্থাও একসময় নতুন ধরনের অনিয়মের পথ তৈরি করতে পারে।
পে স্কেল বনাম দুর্নীতি: মকছেদ সাহেবের দেখা সেই সকালটি আসলে কার গল্প?দুর্নীতি ও গণতন্ত্র: যে শহরে কেউ লাল বাতি মানে না...তাই প্রয়োজন একই সঙ্গে আইন, প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পরিবর্তন। সংসদকে কার্যকর করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে, সরকারি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তথ্য প্রকাশ এবং প্রশ্ন করার অধিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থা।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্নীতি কমানোর দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী সমাজ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ—সবারই এখানে ভূমিকা আছে। যে সমাজ ঘুষকে ‘কাজ করানোর খরচ’ হিসেবে মেনে নেয়, সে সমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না।
তাহলে বাংলাদেশে কি দুর্নীতি কমবে? আমার উত্তর—হ্যাঁ, কমতে পারে। কিন্তু আপনা-আপনি নয়। দুর্নীতি কমাতে হলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে দুর্নীতির লাভের চেয়ে ঝুঁকি বেশি এবং সততার মূল্য বেশি। যেখানে পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, ক্ষমতার চেয়ে আইন এবং ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একক কমিশন, সরকার বা আইন নয়—একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। আমরা যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে আজকের হতাশা একদিন পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। উত্তর হয়তো সত্যিই আমাদের চারপাশেই আছে। প্রয়োজন শুধু সেই উত্তরকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক সাহস। তাই বারবার মনে পড়ে বব ডিলানের কালজয়ী গানটি ‘দ্য আনসার মাই ফ্রেন্ড ইজ ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ অর্থাৎ উত্তরটি আমাদের সবার সামনেই আছে। শুধু এটিকে বাস্তবে গ্রহণ করার ইচ্ছা ও সাহস দরকার।
মামুন রশীদ ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক







