প্রতিবছর ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের অবস্থা বিবেচনা করার এবং তার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে দিবসটি প্রতিটি গণতান্ত্রিক এবং গণতন্ত্রাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্রকে এই আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি করে যে গণতন্ত্রচর্চায় কতটা ঘাটতি আছে, কোথায় নজর দেওয়া প্রয়োজন। দেশে দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য দিনটি হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্পকে আরও দৃঢ় করার এবং তাঁদের ভূমিকা স্মরণ করার দিন।
২০২৬ সালে যখন আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক সময় নয়। দুই দশক ধরেই সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের পশ্চাদ্যাত্রা চলছে। পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় উপনীত হয়েছে, যেখানে কর্তৃত্ববাদী দেশের সংখ্যা উদার এবং নির্বাচনী গণতন্ত্র (ইলেকটোরাল ডেমোক্রেসি) চর্চা করে এমন দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বছরের গোড়াতে প্রকাশিত ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা ৮৭, আর স্বৈরাচারী সরকারের অধীনস্থ দেশের সংখ্যা ৯২।
দুর্নীতি ও গণতন্ত্র: যে শহরে কেউ লাল বাতি মানে না...বৈশ্বিক এই চিত্রের সঙ্গে যা স্মরণ করা দরকার, তা হচ্ছে গণতন্ত্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কেননা অতীতে গণতন্ত্রবিরোধী সরকারগুলো নিজের দেশের ভেতরেই তাদের কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই সব দেশ নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে।
চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, বেলারুশের মতো দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা সহযোগিতা এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। ভারতের মতো বড় দেশগুলো অভ্যন্তরীণভাবে গণতন্ত্রের পথ থেকে যেমন সরে আসছে, তেমনই এ ধরনের জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এই সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র গড়ে না উঠলেও আদর্শিক জায়গা থেকে এদের অবস্থান গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিপরীতে।
অন্যদিকে যেসব দেশ একসময় কনসোলিডেটেড ডেমোক্রেসি বা শক্তিশালী গণতন্ত্র বলে বিবেচিত হতো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র; সেখানেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে, ক্ষমতাসীনদের আচরণ কতটা গণতান্ত্রিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে; সর্বোপরি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থায় চিড় ধরছে।
অবাধ নির্বাচন গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারত্ব তৈরি হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে সরকারের একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়, জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, জনগণ মনে করে তার মৌলিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে, সবার মধ্যে সুযোগের সমতার পথে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে এবং ক্ষমতাশালীদের জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
২০২৩ সালে ২৪টি দেশের ওপর করা পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা যায় যে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, ৭৭ শতাংশ মানুষ, প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের পক্ষে। কিন্তু একই সঙ্গে ৫৯ শতাংশ মানুষ তাদের দেশে গণতন্ত্র যেভাবে চলছে, তাতে সন্তুষ্ট নয়। এদের অধিকাংশই মনে করে যে রাজনীতিবিদেরা তাদের কথা শুনছেন না। এর বাইরেও গণতন্ত্র যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তার মধ্যে আছে সমাজে মেরুকরণ, পরিকল্পিত মিথ্যাচার।
গণতন্ত্রের এই সংকট সত্ত্বেও আশার বিষয় হচ্ছে, মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা এবং নিপীড়নও দমন করতে পারে না। অধিকাংশ স্বৈরাচারী শাসন এবং হাইব্রিড রেজিম (বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা) নির্বাচনকে তাদের ক্ষমতা সংহত করার উপায় হিসেবে সাজিয়ে নেয়। ফলে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুযোগ হয় অত্যন্ত সীমিত; আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের পথই হয়ে ওঠে একমাত্র উপায়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব আন্দোলন ও অভ্যুত্থান ক্ষমতাসীনদের অপসারিত করার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। যেসব কারণ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিল, যেসব ব্যবস্থা ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছিল, যেসব ব্যবস্থা জবাদিহির পথগুলোকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল, সেগুলো অব্যাহত রেখে যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়, সেটা সহজেই বোধগম্য।
স্বৈরাচারের পতন হলেই কি গণতন্ত্র ফেরেসাম্প্রতিক কালে সেসব দেশে নির্বাচনের মাধ্যমেও ক্ষমতা থেকে স্বৈরাচারী শাসকদের সরিয়ে দেওয়া গেছে, যেমন ২০২৩ সালে পোল্যান্ড এবং ২০২৬ সালে হাঙ্গেরি; সেখানেও নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, কী করে অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের তৈরি করা বিচারিক এবং প্রশাসনিক কাঠামোগুলো এবং গণমাধ্যমব্যবস্থাকে জবাবদিহিমূলক করে তোলা যায়।
বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের এই সংকট এবং চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা গত বছরগুলোয় নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন দেশে আন্দোলন-অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছি। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে, বাংলাদেশে ২০২৪, মাদাগাস্কারে ২০২৫ এবং নেপালে ২০২৬ সালে গণ-অভ্যুত্থানগুলো অগণতান্ত্রিক, জনবিচ্ছিন্ন এবং স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছে।
এর বাইরে ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কেনিয়ায়ও সরকারের বিরুদ্ধে, বিশেষত সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থায় জনগণের সীমিত অংশগ্রহণ, জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে তরুণসমাজ জেন–জির আহ্বানে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।
এ রকম একটি পটভূমিকায় এই বছর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এ বছর এই দিবসের তাৎপর্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একটি অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।
তরুণেরা কেন গণতন্ত্র ছেড়ে স্বৈরশাসকদের দিকে ঝুঁকছেনকিন্তু গত কয়েক দশকে বৈশ্বিকভাবেই দেখা গেছে, গণ-অভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক উত্তরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে না। এর জন্য দরকার হচ্ছে ওই সরকারের এবং তার সঙ্গে যুক্তদের পদক্ষেপ, যা পুরোনো ব্যবস্থা, তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনি প্রক্রিয়া বদলে দেবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এগুলো কার্যকর করার একটি রূপরেখা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ প্রতিফলিত হয়েছে।
যে ক্লেপ্টোক্রেটিক ব্যবস্থা স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি হয়, তা সমাজে বৈষম্য এবং দুর্নীতির বিকাশ ঘটায়, সেই একই ব্যবস্থা বহাল রেখে সাময়িকভাবে ক্ষমতাসীনেরা লাভবান হলেও গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হয় না। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে যে জেন-জি প্রজন্মের প্রধান ক্ষোভ, যা জনগণের কাছে সহজেই আবেদন তৈরি করেছে, তা হচ্ছে দুর্নীতি ও সুযোগের সমতার অভাব।
স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটাতে এবং গণতন্ত্রকে স্থায়ী করতে হলে অংশগ্রহণ এবং অংশীদারত্বের পার্থক্য উপলব্ধি করা জরুরি। অবাধ নির্বাচন গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারত্ব তৈরি হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে সরকারের একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়, জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, জনগণ মনে করে তার মৌলিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে, সবার মধ্যে সুযোগের সমতার পথে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে এবং ক্ষমতাশালীদের জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ভেঙে পড়ছে গণতন্ত্র, হুমকির মুখে মার্কিন অর্থনীতিগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ এবং জনগণের অংশীদারত্বের গণতন্ত্রের এই পার্থক্য অনুধাবন করতে না পারলে নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচনে বিজয় এবং তার উদ্যাপনকেই গণতন্ত্র বলে মনে হবে।
স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অনুকূল অতীতের আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো নতুন মোড়কে সজ্জিত করা কিংবা ইতিমধ্যে এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সময়ে যতটা অগ্রগতি হয়েছিল, তা থেকে সরে আসার যে প্রবণতা, স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরির ব্যাপারে যে অনীহা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুত পথ অবলম্বনে যে অনাগ্রহ গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের আচরণে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার যদি না ঘটে, তবে পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়।
৫৪ বছরের শাসনের অভিজ্ঞতা, বারবার গণতন্ত্রের পথচ্যুতি এবং দলমত-নির্বিশেষে ষোলো বছর ধরে অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার ও জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে নিহত-আহত হাজার মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করা ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব; কিন্তু ক্ষমতাসীনদের তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, তাঁদের প্রশ্নের মুখে রাখা, তাঁদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব অন্যান্য রাজনৈতিক দলের, নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর, গণমাধ্যমের এবং নাগরিকদের।
আলী রীয়াজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব







