বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও টানা ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধস, কোথাও শক্তিশালী টাইফুন, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন।
বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, তাইওয়ান, পাকিস্তান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা দেওয়া এসব চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এল নিনো। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে।
বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি-বন্যা-ভূমিধস
বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১১ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বর্তমানে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জনে।
গত ৪ জুলাই থেকে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। পরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে তা সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে।
বান্দরবানে বন্যা
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভারী বৃষ্টি-ভূমিধস
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর, মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে ভারী বর্ষণ জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
হিমাচল প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গাছ উপড়ে পড়েছে এবং অনেক এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। কুলু জেলায় পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ে ৭০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। শিমলায় ২৭টি সংযোগ সড়ক বন্ধ রয়েছে। কালকা-শিমলা জাতীয় সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে পাথরধসের ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন>
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, অতীতের সব রেকর্ড ভাঙার শঙ্কা
ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পেছনে কী এই ‘ওমেগা ব্লক’?
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, চরম আবহাওয়ার সতর্কতা জাতিসংঘের
উত্তরাখণ্ডেও টানা বৃষ্টিতে ১১৮টি সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। ভূমিধসে যমুনোত্রী জাতীয় মহাসড়কের প্রায় ১০০ মিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গঙ্গোত্রী মহাসড়কেও বারবার পাথর ধসের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। গঙ্গা, যমুনা ও তাদের উপনদীগুলোর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জম্মু-কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলায় আকস্মিক বন্যায় বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৫ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। মিজোরামের লুংলাই জেলায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ৮০টির বেশি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভূমিধসের কারণে জাতীয় মহাসড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ রয়েছে এবং অনেক পর্যটক কয়েকদিন ধরে আটকা পড়েছেন। ত্রিপুরায় বন্যায় চার হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ১১ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বৃষ্টিতে কলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যানজট সৃষ্টি হয়েছে। কলকাতার সল্টলেক সেক্টর-ফাইভসহ বিভিন্ন এলাকায় অফিসগামী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ১০ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে আরও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ভারতে ভূমিধস
চীন-জাপান-তাইওয়ানে টাইফুন
এদিকে জাপান ও তাইওয়ানে তাণ্ডব চালানোর পর শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ শনিবার রাতে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশে আঘাত হেনেছে। ঝড়ের আগে চীনে ১৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তাইওয়ানে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে দেড় লাখের বেশি পরিবার। বাতিল হয়েছে এক হাজার ১০০টির বেশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। রাজধানী তাইপেতে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতির বাতাস এবং এক মিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
জাপানের ওকিনাওয়ায় ২৪ হাজারের বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। বাতিল হয়েছে ৩৪৫টি ফ্লাইট এবং ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
চীনে পৌঁছানোর আগে টাইফুনটি ফিলিপাইনে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি করেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। ১১ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পাকিস্তানে বন্যা-ভূমিধসের পূর্বাভাস
অন্যদিকে ভারী মৌসুমি বৃষ্টির কারণে পাকিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) দেশজুড়ে বন্যা, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, টানা বৃষ্টির ফলে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যা দেখা দিতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ
ইউরোপেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন মাস ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন। ওই মাসে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় তিন ডিগ্রিরও বেশি বেশি।
আরও পড়ুন>
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, অতীতের সব রেকর্ড ভাঙার শঙ্কা
ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পেছনে কী এই ‘ওমেগা ব্লক’?
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো, চরম আবহাওয়ার সতর্কতা জাতিসংঘের
তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, স্পেন ও বেলজিয়ামে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানির রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, চলতি বছরে দেশটিতে তাপজনিত কারণে অন্তত ৫ হাজার ১২০ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ২৭০ জনের বয়স ছিল ৭৫ বছরের বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হিট ডোম’ নামে পরিচিত উচ্চচাপ বলয়ের কারণে এবারের তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহ
এল নিনোর প্রভাব
এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হবে। সাধারণত এল নিনোর প্রভাব নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ভারী বৃষ্টি, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, আগাম আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কতা মানুষের জীবন রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর এই পরিবর্তন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এল নিনোর প্রভাব এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, এনডিটিভি, পাকিস্তানটুডে
এমএসএম








