সুরা বাকারা কোরআনের দীর্ঘতম সুরা, আয়াত সংখ্যা ২৮৬, রুকু বা পরিচ্ছেদ সংখ্যা ৪০। মুফাসসিরগণের মতে এই সুরায় এক হাজার সংবাদ, এক হাজার আদেশ এবং এক হাজার নিষেধের সমাবেশ ঘটেছে।

সুরা বাকারা পবিত্র কোরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ সুরা। রাসুলুল্লাহর (সা.) বহু হাদিসে এই সুরার বিশেষ মাহাত্ম ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না, নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়। (সহিহ মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে এসেছে, যে ঘরে পর পর তিন রাত সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত পাঠ করা হয়, শয়তান সেই ঘরের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। (সুনানে তিরমিজি)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সুরা বাকারা শিক্ষা করো। কারণ এটি গ্রহণ করার মাঝে রয়েছে বরকত এবং বর্জন করার মাঝে রয়েছে অনুতাপ। কোনো বাতিলপন্থী বা জাদুকর এর মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে না। (সহিহ মুসলিম)

সুরা বাকারার বিভিন্ন আয়াতে এমন কিছু অর্থবহ ও হৃদয়স্পর্শী দোয়া রয়েছে, যা মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা উচিত। এখানে আমরা সুরা বাকারার ৭টি দোয়া উল্লেখ করছি:

১. ফেরেশতাদের তাসবিহ ও অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি

 سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

উচ্চারণ: সুবহানাকা লা ইলমা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা, ইন্নাকা আন্তাল আলীমুল হাকীম।

অর্থ: পবিত্র তোমার সত্তা! তুমি আমাদের যা শিখিয়েছ, তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই তুমি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা বাকারা: ৩২)

আরও পড়ুন

ফেরেশতাদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

২. কাবা ঘর নির্মাণের সময় ইবরাহিম ও ইসমাইলের (আ.) দোয়া

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: রব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আন্তাস সামীউল আলীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করো; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা বাকারা: ১২৭)

৩. অনাগত বংশধরদের জন্য ইবরাহিম ও ইসমাইলের (আ.) দোয়া

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

উচ্চারণ: রব্বানা ওয়াজআলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন জুররিয়্যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়া তুব আলাইনা, ইন্নাকা আন্তাত তাউওয়াবুর রাহীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও আপনার এক অনুগত উম্মত তৈরি করুন। আর আমাদের ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা বাকারা: ১২৮)

আরও পড়ুন

কোরআনে বর্ণিত হজরত ইবরাহিমের (আ.) ৪ দোয়া

৪. অনাগত বংশধরদের মধ্যে রাসুল প্রেরণের জন্য ইবরাহিমের (আ.) দোয়া

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

উচ্চারণ: রব্বানা ওয়াবআস ফীহিম রসূলাম মিনহুম ইয়াতলূ আলাইহিম আয়াতিকা ওয়া ইউআল্লিমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাতা ওয়া ইয়ুঝাক্কীহিম, ইন্নাকা আন্তাল আজীজুল হাকীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সুরা বাকারা: ১২৯)

৫. দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুন্‌ইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আযাবান নার।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা: ২০১)

৬. যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্য ও অবিচলতার জন্য বাদশাহ তালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর দোয়া

 رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: রব্বানা আফরিগ আলাইনা সবরাওঁ ওয়া সাব্বিত আক্বদামানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বওমিল কাফিরীন।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের কদম সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। (সুরা বাকারা: ২৫০)

আরও পড়ুন

শয়তানকে ঘর থেকে দূরে রাখে যে দুটি আয়াত

৭. আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও সাহায্য প্রার্থনার দোয়া

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: রাব্বানা লা তুআখিজনা ইন-নাসীনা আও আখত্ব’না রাব্বানা ওয়ালা তাহমিল আলাইনা ইসরাং কামা হামালতাহু আলাল্লাজীনা মিং কাবলিনা রাব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মা লা ত্বাকাতালানা বিহ। ওয়া’ফু আন্না ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা আংতা মাওলানা ফাংসুরনা আলাল কাওমিল কাফিরীন।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের উপর বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এমন কিছু বহন করাবেন না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের মার্জনা করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, আর আমাদের উপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। (সুরা বাকারা: ২৮৬)

ওএফএফ