বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ শত শত নদীর জালে গঠিত এই ভূখণ্ডের আশীর্বাদ যেমন নদী, তেমনি অভিশাপও বন্যা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হলেও কিছু কিছু বছর বন্যা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, তা দেশের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। এসব বন্যা শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতিই করেনি, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে টানা মৌসুমি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করেছে। সাতটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
চলুন বাংলাদেশের ইতিহাসের কয়েকটি ভয়াবহ বন্যা সম্পর্কে জেনে আসি। যার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে ইতিহাসে-
১৯৭৪ সালের বন্যা: স্বাধীনতার পর প্রথম বড় দুর্যোগ
স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সে সময় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, বন্যার সঙ্গে খাদ্যসংকট মিলেই ওই সময়ের মানবিক বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
আরও পড়ুন
বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে যা করা জরুরি
১৯৮৭ সালের বন্যা: উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি
১৯৮৭ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ভয়াবহ। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে, রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষিতে বড় ধাক্কা লাগে। এই বন্যার পর দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
১৯৮৮ সালের বন্যা: রাজধানীও রক্ষা পায়নি
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বন্যাগুলোর একটি ১৯৮৮ সালের বন্যা। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। ঢাকার বড় অংশও প্লাবিত হয়, যা সে সময়ের জন্য ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।
এই বন্যায় লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বন্যার পর রাজধানীকে রক্ষায় বিভিন্ন বন্যা প্রতিরোধ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ আরও জোরদার হয়।

১৯৯৮ সালের বন্যা: দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ বন্যাগুলোর মধ্যে ১৯৯৮ সালের বন্যা অন্যতম। প্রায় দুই মাসের বেশি সময় দেশের বিশাল অংশ পানির নিচে ছিল। ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।
ধান, পাট, সবজি, মাছের খামার সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষতি হয়। লক্ষাধিক পরিবার দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিল। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েন। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও ছিল কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০০৪ সালের বন্যা: নগর ও গ্রাম একসঙ্গে বিপর্যস্ত
২০০৪ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে। জলাবদ্ধতা ও পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি, ব্যবসা ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
আরও পড়ুন
আষাঢ় ঘিরে বদলে যায় বাঙালির জীবনযাত্রা
২০০৭ সালের বন্যা: বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের দ্বৈত আঘাত
২০০৭ সালে ভয়াবহ বন্যার পর একই বছর ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে। ফলে দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
২০১৭ সালের বন্যা: কৃষিতে বড় ধাক্কা
২০১৭ সালের বন্যায় উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা ও মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিশেষ করে ধানখেত তলিয়ে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। গবাদিপশু, মাছের খামার এবং গ্রামীণ সড়কও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

২০২০ সালের বন্যা: করোনার মধ্যেই নতুন সংকট
করোনা মহামারির মধ্যেই ২০২০ সালে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দেয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। লাখো মানুষ একদিকে বন্যা, অন্যদিকে মহামারির ঝুঁকি মোকাবিলা করেন। স্বাস্থ্যসেবা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২২ সালের সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা
২০২২ সালে সিলেট ও সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাহাড়ি ঢলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হন এবং উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনী অংশ নেয়।
আরও পড়ুন
শহরেও বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু: সুউচ্চ ভবন কতটুকু রক্ষা করতে পারে
কেন বাংলাদেশে বারবার ভয়াবহ বন্যা হয়?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই বন্যার প্রধান কারণ। দেশের প্রায় সব বড় নদীর উজান প্রতিবেশী দেশে হওয়ায় অতিবৃষ্টি হলে দ্রুত পানি নেমে আসে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দুই ধরনের দুর্যোগই বাড়তে পারে। তাই শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, আগাম সতর্কবার্তা, টেকসই নগর পরিকল্পনা, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
বাংলাদেশ বহুবার ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
কেএসকে








