প্রতিবছরই টানা ভারী বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায় উত্তরবঙ্গের প্রধান বাণিজ্যনগরী বগুড়া। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল থেকে শুরু হওয়া টানা ১৭ ঘণ্টার রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিতে শহরের চেনা রূপ বদলে গেছে। সড়ক থেকে অলিগলি সব এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও হাঁটু সমান নোংরা পানিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এ পরিস্থিতির মধ্যেই একচিলতে আশার আলো দেখাচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের এক মহাপরিকল্পনা। শহরের ২৫ বছরের পুরোনো এ জলজট চিরতরে দূর করতে রেলগেট থেকে ফটকি ব্রিজ পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল মেগা ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে মিশবে।

বগুড়া আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আশেকুর রহমান জানান, বুধবার বিকেল ৩টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৪ মিলিমিটার ভারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার বিকেলের মাত্র ৬ ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ৭৯ মিলিমিটার।
এ ভারী বর্ষণের ফলে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা, শেরপুর রোড, সূত্রাপুর, সেউজগাড়ি, জামিলনগর ও সরকারি আজিজুল হক কলেজসহ বিভিন্ন এলাকার পিচঢালা পথ এখন পানির নিচে।

রাস্তায় পানি জমে থাকায় রিকশা ও অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে গেছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও যানবাহন না পেয়ে বাধ্য হয়ে নোংরা পানি ভেঙে গন্তব্যে ছুটছেন মানুষ। জহুরুলনগর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাচ্ছি না। একটু বৃষ্টি হলেই যদি শহরের এ হাল হয়, তবে আমাদের ট্যাক্স দেওয়ার মানে কী?’

বৃষ্টির কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়েছেন। সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী রিসান আফ্রিদি বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই ক্যাম্পাস পানির নিচে চলে যায়। আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।’

শহরের নিউ মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী মিলন রহমান জানান, ক্রেতা না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে সময়ের আগেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন।

শহরের বাসিন্দাদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় এ সমস্যা হচ্ছে। অনেক জায়গায় রাস্তার চেয়ে ড্রেন বেশি উঁচু।

ব্যাংক কর্মকর্তা মো. খোকন মিয়া বলেন, ‘এ দুর্ভোগের জন্য আমরাও দায়ী। প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলছি, এ কারণে ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে পানি কমছে না।’

বগুড়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হচ্ছে বড় পরিকল্পনা

পরিস্থিতি দেখতে বুধবার মাঝরাতে এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে বের হন বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের নতুন প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন। পরিদর্শনের সময় ড্রেনের ভেতর বালির বস্তা, পলিথিন ও ফাস্টফুডের প্লাস্টিকের প্যাকেট আটকানো দেখা যায়।

প্রশাসক বলেন, ‘বগুড়ার এ সমস্যা প্রায় ২০-২৫ বছরের পুরোনো। সিটি কর্পোরেশন হওয়ার বয়স মাত্র তিন মাস। তাই এখনই জাদুকরী কোনো পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না।’

তিনি নাগরিকদের সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আরও বলেন, ‘শহরের ড্রেনগুলো ফাস্টফুডের পরিত্যক্ত প্যাকেটে ভরপুর। শহরটাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে। বগুড়া শহরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। করতোয়া নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা তৈরি হওয়া এবং সুবিল খালসহ বড় বড় জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।’

শহরের পানি সহজে নামার জন্য সিটি কর্পোরেশন কিছু বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বড় উদ্যোগ হলো, একটি মেগা ড্রেন নির্মাণ। রেলগেট থেকে ফটকি ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ বাই ১০ ফিট আয়তনের এ মূল ড্রেনটি তৈরি করা হবে, যা সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে মিশবে। এর পাশাপাশি বুজরুকবাড়ীয়া থেকে ফতেহ্ আলী ব্রিজ পর্যন্ত আরও পৌনে ৩ কিলোমিটার সহায়ক ড্রেন তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার টেন্ডার প্রক্রিয়া দ্রুতই সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার পুঞ্জীভূত পানি নিষ্কাশনের জন্য তা জেলা পরিষদের পাশের ড্রেনের সাথে যুক্ত করা হবে। যা সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে মিলবে।

বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা, এ পরিকল্পনাগুলো শুধু কাগজে-কলমে না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। জলাশয়গুলো উদ্ধার করা গেলে এবং নাগরিকেরা সচেতন হলে রাজশাহী শহরের মতো বগুড়াও একদিন একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও আধুনিক শহর হয়ে উঠবে।

কেজে/এএসএম