খৈয়াম কাদের
সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা সংক্রান্ত বিতর্ক সাহিত্যের জন্মকাল থেকেই চলে আসছে। সুতরাং সাহিত্য এবং সাহিত্যে অশ্লীলতা সংক্রান্ত বিতর্ক দুই-ই সমদৈর্ঘ্যে প্রাচীন। তবে এই বিতর্ক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। কোনো কোনো সাহিত্যবোদ্ধা ও বিশ্লেষক এই কথিত অশ্লীলতাকে মেনে নিতে নারাজ। কেউ কেউ আবার একে অশ্লীলতা বলতেই নারাজ। সাধারণভাবে সাহিত্যশিল্পে অশ্লীলতা মানে যৌনতার খোলামেলা উপস্থাপনা। এ কারণে রক্ষণশীল পক্ষগুলো সাহিত্য-ক্ষেত্রে এর চিত্রায়ণকে নিষিদ্ধ করতে একাট্টা। পক্ষান্তরে প্রগতিশীল উদারপন্থিরা এর প্রয়োগ ও ব্যবহারকে পুরোপুরি যৌক্তিক ও অপরিহার্য মনে করেন। মনন, চিন্তন ও দর্শন জগতের দগ্ধজনদের মতে সাহিত্য হলো যাপিত, যাপজ্য এবং যাপিতব্য জীবনের বাস্তবতাশ্রিত কল্পচিত্রের শিল্পিত প্রকাশ। আর জীবন নামের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রপঞ্চটি একটি অখণ্ড সমগ্র; যার ভেতরে শুভতা, শ্লীলতা, সৌন্দর্য এবং ইতিবাচকতার পাশাপাশি অশুভতা, অশ্লীলতা এবং পঙ্কিলতাও সতত সংস্থিত।
অন্যদিকে যে যৌনতাকে সাহিত্যে অশ্লীলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; সেই যৌনতাই তো জীবনের উদ্গমন ও প্রবাহনের অনন্ত এবং শাশ্বত সিঁড়ি। অর্থাৎ যৌনতা নেই তো নব-প্রজনন নেই, প্রজনন নেই তো নবজন্ম নেই, নবজন্ম নেই তো জীবন নেই, জীবন নেই তো কিছুই নেই। এই কিছুইহীনতা তো অনন্ত আঁধারের পাতা, অনন্ত আলোহীনতা। তাহলে বিষয়টি এই দাঁড়ায় যে, যৌনতাই জীবনের একমাত্র সৃজনকলা; যৌনতা থেকেই উৎসারিত হয় জীবনের অস্তিত্ব। একইভাবে অশ্লীলতা, পঙ্কিলতা এবং অশুভতাও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রকৃতিগত এবং বিজ্ঞান-সম্মত এই পার্থিব বাস্তবতার আলোকে এ কথা মানতেই হয় যে, সাহিত্য যেহেতু জীবন-সমগ্রের কল্প-শৈল্পিক প্রতিবিম্বন; সেহেতু এখানে যৌনতার উপস্থিতি অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য। সুতরাং মনস্তত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মবাদী অধিদর্শনের পাশাপাশি ফলিত বিজ্ঞানের দিক থেকেও যৌনতাহীন শিল্পসাহিত্য অসম্পূর্ণ এবং অসার। এ ছাড়া যৌনক্রিয়া নিজেও সংজ্ঞাতীত রকমের মনোদৈহিক আনন্দ উৎসারী অনিন্দ্য শিল্পখেলা।
সুদূর অতীতের গুপ্তযুগের কবি কালিদাস। তিনি লিখেছেন সংস্কৃত ভাষায়। ভারতবর্ষে তাঁকে জগতখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়ারের মতো সর্বকালজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর অনেক গ্রন্থের মধ্যে ‘মেঘদূত’ এবং ‘শকুন্তলা’ই সর্বাধিক বিদিত। সুপ্রাচীন কালের এই মহান কবির সৃষ্টিকর্মেও যৌনতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে সপ্রতিভ ভঙিমায়। তিনি শকুন্তলার নাক, চোখ, চুল ও মুখমণ্ডলের অপরূপ সৌন্দর্যের যে অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন, তা ভীষণভাবে যৌনোদ্দীপক হয়ে উঠেছে। একইভাবে বাংলা কাব্য-সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাগীতি এবং দোহাতেও নর-নারীর রতি-রমনের চিত্র স্পষ্ট এবং প্রবল।
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থশালা থেকে চর্যাকাব্যের সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ উদ্ধার করেন। পরে ১৯১৬ সালে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ কর্তৃক সেই পদগুলো ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে গ্রন্থিত হয়। এখানে ৮৪ জন সহজিয়া বৌদ্ধাচার্যের সন্ধান পাওয়া যায়। যাঁদের মধ্যে ২৩ জন বাঙালি চর্যাকার। এই ২৩ জনের মধ্যে বঙ্গের আদিকবি মীননাথ এবং একমাত্র নারীকবি কুক্কুরীপাসহ উল্লেখযোগ্যরা হলেন- কাহ্নপা বা কাহ্নুপা, লুইপা, ডোম্বীপা, টেন্ডনপা, শবরপা, বিরুপা, ধামপা, ভুসুকু, গুডরী প্রমুখ। এ গ্রন্থে সংকলিত পদগুলোর সতেরোটিতেই সেই সময়ের নারীজীবনের নানান প্রসঙ্গ অঙ্কিত হয়েছে সহজিয়া বৌদ্ধতন্ত্রের রহস্যমুখী চিন্তার আবহে। এসব চর্যাপদে চতুর্বর্ণ-নির্ভর অভিজাত আর্যসমাজ বহির্ভূত নিম্নবর্গীয় অন্ত্যজ নারীদের পেশা ও বেসাতির পাশাপাশি তাদের যৌনজীবনের ভেতর-বাহিরও তুলে ধরা হয়েছে একদম অনাড়ষ্ট ভাষায়।
সামাজিকভাবে নিম্নশ্রেণিভুক্ত এই রমণীদের পেশাগত গোত্রীয় পরিচিতি ছিল- ডোমনী (শ্মশানকর্মী), শুঁড়ী (মদবিক্রেতা), শবরী (শিকারী), শুণ্ডিনী (হস্তিপোষক), ধীবরী (মৎসজীবী), ধোপিনী (পোশাক প্রাক্ষলক), চণ্ডালী বা চাঁড়াল ইত্যাদি। আর্য সমাজে এরা ছিল অস্পৃশ্য। এদের ছায়া মাড়ানোই ছিল উচ্চবর্ণীয় আর্যদের জন্য জাত হারানোর সামিল। অথচ আর্য সমাজের অভিজাত পুরুষেরা একদম নির্দ্বিধায় অন্ত্যজ শ্রেণির এই অস্পৃশ্য নারীদের সঙ্গে অহরহ রতিরমনে তথা দেহমিলনে লিপ্ত হতো। জৈবনিক বাস্তবতার এরূপ নানাকৌণিক অভিঘাতের ফলে এই নারীরা দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরে এবং বাইরে উভয় পথেই দেহাতী রিরংসাভোগে, তথা কামসম্ভোগে আগ্রহী এবং অভ্যস্ত ছিল। এমনকি ‘সাঙ্গা’ প্রথার মাধ্যমেও এই শ্রেণির নারী-পুরুষদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হতো। সাঙ্গা সম্ভবত সেকালে প্রচলিত একধরনের অস্থায়ী বা সাময়িক বিয়ের মতোই একটি প্রথা ছিল। নারী যৌনতার এমন বহুগামীতার কারণে চর্যাকবিগণ প্রায়শই তাদের ‘কামচণ্ডালী’ বা ‘ছিনাল’-এর মতো কামাকাঙ্ক্ষি অর্থের অশ্লীল শব্দে সম্বোধন করতেন। নারীর পরকীয়-ছিনালীপনা নিয়ে দ্বিতীয় চর্যায় বলা হয়েছে—
‘সুসুরা নিদ গেলে বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিলে কা গই মাগঅ।।
দিবসই বহুড়ী কাউই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলেঁ কামরু জাঅ।।’
অর্থাৎ মধ্যরাতে ঘরে চোর ঢুকে গৃহবধূর কর্ণভূষণ কানেট নিয়ে পালিয়ে যায় এবং সেই অলঙ্কারের আর কোনো সন্ধান মেলে না। এখানে মধ্যরাত, ঘরের বউ এবং কর্ণালঙ্কার চুরি যাওয়া—সবকিছুর মধ্যেই পরকীয়া যৌনাচারের একটি পরোক্ষ এবং প্রতীকী ইঙ্গিত রয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যে বধূ দিনের বেলায় কাকের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে, সে-ই আবার ঘুমন্ত শ্বশুরের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের অন্ধকারে কামরূপে যায়; অর্থাৎ অন্ধকার জঙ্গলে যায় পরপুরুষের সাথে দৈহিক মিলনের উদ্দেশ্যে।
এ ছাড়া শবর-শবরীর দাম্পত্য-প্রেমে উদযাপিত উন্মত্ত মিলনসুখের প্রসঙ্গও এসেছে একাধিক পদে। যেমন পঞ্চাশ নাম্বার পদে বলা হয়েছে—
‘কঙ্গুচিনা পাকেলা রে শবরাশবরী মাতেলা।
আনুদিন সবরো কিম্পি না চেবই মহাসুঁহে ভেলা।।’
ব্যভিচারী পরকীয়া যৌনাচারের বাইরে হৃদায়ার্দ্রিক আবেগি প্রেমের নজিরও পাওয়া যায় চর্যাগীতি ও দোহার কোনো কোনো পদে। এগারো নাম্বার পদে দেখা যায় নগর-বাইরের কুঁড়েঘর-বাসীনি ডোমনি-যুবতী ব্রাহ্মণ বালক কাহ্নকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেঁটে যায়। কাহ্নও তার কোমল স্পর্শ পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে, উন্মাদ হয়ে পড়ে। কাহ্ন কাপালিক যোগী হয়ে যায়; নটের ঝাঁপি ছেড়ে গলায় হাড়ের মালা পরিধান করে। তাঁর ডোমনি-যুবতীকে পাওয়ার প্রেমাকাঙ্ক্ষা এতটা উন্মত্ততায় পৌঁছায় যে, একপর্যায়ে সে নিজের ঘরের শাশুড়ি ননদ ও শালিসহ গর্ভধারিণী মাকে পর্যন্ত হত্যা করে। চর্যাপদের ভাষায়—
‘নগর বহিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।
ছোই ছোই জাহ সো ব্রাহ্ম নাড়িআ।।
------------------------------
মারিঅ সাসু নণন্দ ঘরে সালী।
মাঅ মারিঅ কাহ্ন ভইঅ কবালী।।’ (১১)
বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতমবুদ্ধ স্বয়ং তাঁর ধর্মে নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ করে গেছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে একসময় এই ধর্মে যোগ ও তন্ত্র সাধনার প্রবেশ ঘটে। তখন এই যোগী ও তান্ত্রিকদের মোক্ষলাভের নিমিত্তে যোগিনী ও সাধিকার প্রয়োজন হয়। চর্যাগীতিকায় সাধক আর যোগিনীর দেহমিলনের চিত্র পাওয়া যায়। যোগিনী তার নিতম্ব চেপে সাধককে আলিঙ্গন দেয়। যোগী-যোগিনী একে-অপরকে ছাড়া মুহূর্তক্ষণও থাকতে পারে না। যোগিনীর মুখচুম্বনে যোগী সুধারস পান করে। রতিক্রিয়া তাদের ধীরস্থির করে, প্রশান্ত করে। তাদের বিমূর্ত সাধনা মূর্তরূপ পায়।
চর্যাকাব্যে বর্ণিত একই নারীর একাধিক পুরুষের দেহলগ্নী হওয়ার বিষয়টিকে আধুনিক যৌন-মনস্তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। ইংরেজিতে একটি উক্তি আছে ‘She does better than he’. বাক্যটিতে স্পষ্টত নর-নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা, যৌন সক্ষমতা এবং যৌনসুখ সম্ভোগের মাত্রাকে নির্দেশ করা হয়েছে। এখানে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে যে, যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষের চাইতে নারী অগ্রগামী এবং উচ্চস্তরীয়। অর্থাৎ পরিপূর্ণ সুস্থ দেহ-মনের অধিকারী একজন পুরুষ অনুরূপ সুস্থ একজন নারীর যৌনসঙ্গী হিসেবে যথেষ্ট নয়। অথচ সহস্র সহস্র অব্দজুড়ে পুরুষ-প্রবর্তিত নানারকম ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও শারীরিক ফেনোমেনার অজুহাতে নারীদেহে সৃষ্টিগতভাবে উপিত এই প্রবলতর যৌন অনুভূতিকে নিষ্ঠুরভাবে অবদমিত করা হয়েছে। সেদিক থেকে বলা চলে, চর্যাযুগের অন্ত্যজ বাঙালি নারীরা যৌনতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেছে। এখন কথা হলো, চর্যাপদের কবিগণ যদি অশ্লীলতার ছুতোয় তাদের গীতিকাব্যে তৎকালীন যৌনজীবনের অধ্যায়টিকে উপেক্ষা করে যেতেন। তাহলে সমাজ-বাস্তবতার এই অনিবার্য ইতিহাসটি আজ অনুদ্ঘাটিতই রয়ে যেত। সুতরাং সাহিত্য যেহেতু জীবন-প্রকৃতির একটি সামগ্রিক প্রতিচিত্র নির্মাণ করে সেহেতু অশ্লীলতার অজুহাতে যৌনতাকে সাহিত্যশিল্পের নান্দনিক ও দার্শনিক অঙ্গন থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা চলবে না, বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
বারো শতকের প্রখ্যাত সংস্কৃত-কবি জয়দেব। তিনি ছিলেন গৌড়ের রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি। তাঁর সর্বাধিক আলোচিত কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’। এই গ্রন্থেও নর-নারীর রতি রসায়নের তাৎপর্যপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়। চৈতন্যপূর্ব আদি মধ্যযুগের বাঙালি কবি বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এবং আঠারো শতকের বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যসহ সেই সময়কার আরও অনেক কাব্যশিল্পে মানুষের যৌনকামনা ও যৌনাচারের উপস্থাপনা ছিল খুবই স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক বিষয়। আরেক দিকে সপ্তদশ শতকের আরাকান রাজসভার বিপুল জনপ্রিয় বাঙালি কবি আলাওলের বহুল পঠিত এবং ব্যাপক আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘পদ্মাবতী’তেও মানুষের কামচেতনার প্রকাশ ঘটেছে অসাধারণ নান্দনিকতায়। এই কাব্যে কবি পদ্মাবতীর দৈহিক সৌন্দর্যের এমন সুনিপুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন, যা পাঠকের দেহমনে খুব স্বাভাবিকভাবেই কামকাতরতার আবেশ সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক কালের বাংলা ভাষার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩-০৪ জানুয়ারি ১৯৯৭) আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’তেও (দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ উপন্যাস: প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬) সামাজিকভাবে অস্বীকৃত এবং অবৈধ যৌন-সম্পর্কের একটি বিশেষ উপাখ্যান উপযোজিত হয়েছে। এ উপন্যাসের গল্পাখ্যানের সময় ও ক্ষেত্র ব্যাপক বিস্তৃত। এতে সন্নিবিষ্ট এবং সংবিষ্ট হয়েছে ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসনের শেষভাগ ও তদ্বিরোধী ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্ববঙ্গীয় খণ্ড অধ্যায় ‘ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ সম্পর্কিত জনশ্রুতি ও লোককথা, তেভাগা আন্দোলনের প্রত্যাশা ও পরিনতি, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও সংকট, ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ভাগোত্তর স্বপ্নভঙ্গ—ইত্যাকার বিষয়-আশয়। তবে ‘খোয়াবনামা’য় বৃটিশ-ভারতের শেষপাদ এবং স্বাধীনতা উত্তর বিভাজিত পূর্বপাকিস্তানের সুদীর্ঘ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক এবং আর্ত ও আর্থ-রাজনৈতিক ইতিহাসের চিত্রটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ইলিয়াস এ গল্পের স্থানিক ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের পূর্ব-বগুড়ায় অবস্থিত ‘কাতলাহার’ নামে এক ঐতিহাসিক বিল, ঘটনা-সংশ্লিষ্ট চরিত্র হিসেবে নিয়েছেন এই বিল-সন্নিবর্তী এলাকার মানুষ এবং কাহিনি বুননে বিন্যাস্ত করেছেন তাদের বিশ্বাস, আচার-প্রথা, পেশা ও জীবনযাপন সংক্রান্ত নানান অনুষঙ্গ।
আরও পড়ুন
আল মাহমুদের কবিতায় শক্তির জায়গা
এ গল্পে অঙ্কিত কার্যকারণিক মানব চরিত্রগুলো হলো—তমিজ, তমিজের বাপ, তমিজের সৎমা কুলসুম, শরাফত মণ্ডল, কেরামত আলী, কালাম মাঝি, ফুলজান, কাদের, আজিজ প্রমুখ। এ ছাড়া কাতলাহার বিল এবং বিল-পাড়ের বহু পুরোনো পাকুড়গাছও প্রতীকী চরিত্র হিসেবে গল্পের আখ্যানপটে গভীর রহস্যের আবেশ সৃষ্টি করে। ঘটনা-পরম্পরার একপর্যায়ে পাঠক দেখতে পান তমিজ তার সৎমা কুলসুমের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এতে কুলসুমের পক্ষ থেকেও কোনো আপত্তি বা অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। অর্থাৎ এখানে শাশ্বত জৈবিক চাহিদার অরোধ্য আকর্ষণই প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর একে প্রভাবিত করে বিলপাড়ের লোকপুরাণাশ্রিত পাকুড়গাছের রহস্যময় ছায়া এবং তাদের গ্রাম-বিচ্ছিন্ন নির্জন বাস। এ ছাড়া ঘটনাটি হঠাৎ করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ঘটে এমনটিও নয়। বরং এটি অনেকগুলো ঘটনার দীর্ঘ পরম্পরার অনিবার্য পরিনতি। তা সত্ত্বেও ধর্মীয় বিধান, সামাজিক রীতি ও রাষ্ট্রীয় আইন—সবদিক থেকেই সৎমা ও সৎপুত্রের মধ্যকার যৌন সম্পর্কটি সম্পূর্ণরূপে অবৈধ এবং অস্বীকৃত।
সুতরাং সাহিত্যে চিত্রিত এ ধরনের যৌন সংসর্গকে অশ্লীল বলা খুবই স্বাভাবিক এবং সংগত। কিন্তু ঘটনাটিকে জৈবনিক বাস্তবতা ও যৌন মনস্তত্ত্বের নিরিখে, তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, বসবাসের অবস্থান, পেশা ও জ্ঞানগত অবস্থিতি এবং সামাজিক আর্থিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির আলোকে বিচার করা হলে পাঠক-মনে সৃষ্ট অভিযোগ ও ঘৃণার মাত্রা অনেকখানি প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একইসাথে একে অশ্লীল বলার বিষয়টিও একটি উদার ভিত্তির ওপর দাঁড়াবার অবকাশ পায়। কারণ এখানে অঙ্কিত যৌন-সম্ভোগের দৃশ্যটি মূলত জীবন-বেদের গহনস্থিত রহস্যঘন সত্যের উন্মোচন মাত্র। সাহিত্যে যৌন-মনস্তত্ত্বের এমন অধিপঠন বিংশ শতাব্দীর একদম গোড়ার দিককার আমেরিকান নাট্যকার ইউজিন ও’ নিলের বিখ্যাত নাটক ‘ডিজায়ার আন্ডার দ্য এলমসেও’ পাওয়া যায়। অনাবৃত কামদৃশ্যের উৎকলন থাকায় তৎকালীন আমেরিকান সরকার নাটকটি নিষিদ্ধ করেছিল। এমনকি অশ্লীল দৃশ্য মঞ্চায়নের অভিযোগে এই নাটকে অভিনয় করা কুশীলবদেরও যেতে হয়েছিল জেলে। নাটকের সেটিং নিউ-ইংল্যান্ডের একটি প্রান্তিক গ্রাম। গ্রামের একাংশে উর্বরতার অভাবাক্রান্ত বিঘা-কয়েক জমির ওপরে একটি কৃষক-বাড়ি। বাড়িটিকে ছায়াবৃত করে রেখেছে তিনটি পুরোনো এলমস বৃক্ষ এবং গ্রামের অন্যান্য কৃষকবাড়ি থাকে এটি খানিকটা বিচ্ছিন্ন। এখানে বসবাস করে বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা মালিক এফ্রেইম ক্যাবোট, তার প্রথম স্ত্রীর পক্ষের দুই পুত্র সিমিয়ন ও পেটার, দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত ছেলে এবেন এবং ক্যাবোটের তৃতীয় স্ত্রী পঁয়ত্রিশ বছরের উষ্ণ যৌবনা এবি।
নাটকের কাহিনিতে ট্র্যাজিক ক্যাটাস্ট্রফি ঘটে সৎমা এবি এবং সৎপুত্র এবেনের মধ্যে স্থাপিত শারীরিক সম্পর্কের জের ধরে। এবেন প্রথম দিকে এবির আগমন মেনে নিতে পারেনি। সে মনে করতো এই ফার্ম-হাউজটি গড়ে তোলার পেছনে তার মৃত মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। সুতরাং বৃদ্ধ পিতা ক্যাবোটের মৃত্যুর পর এই বাড়ির একমাত্র উত্তরাকারী হবে সে। কিন্তু এবি যদি ক্যাবোটকে একটি পুত্রসন্তান দিতে পারে, তাহলে তো ক্যাবোট বাড়িটি তাকেই দিয়ে দেবে। এবির মনেও এমন ভাবনা কিছুটা ছিল। উভয়ের মনের এই জটিল বৈষয়িক ভাবনা সত্ত্বেও একপর্যায়ে তারা একে-অপরের সাথে গভীর আবেগের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ক্যাবোটের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা নিয়মিত যৌনমিলন করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে এবি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। এ ঘটনায় ক্যাবোট ভীষণ খুশি হয় এবং গ্রামবাসীকে আমন্ত্রণ করে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে তা উদযাপন করে।
এ অবস্থায় এবেনের মনে হয় তার পূর্বের অনুমানই সত্য। এবি তার সঙ্গে ভালোবাসার ছলনা করেছে। তার মাধ্যমে সে একটি পুত্রসন্তান নিয়েছে নিজের অনুকূলে ক্যাবোটের ফার্মহাউজের উত্তরাধিকার সৃষ্টির লক্ষ্যে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এবেন চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠে; এবিকে ভর্ৎসনা করতে থাকে, অভিযুক্ত করতে থাকে। এবি এবেনকে প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সে ফার্মহাউজ চায় না; সে এবেনকে চায়, এবেনের ভলোবাসা চায়। কিন্তু এবেনের উন্মত্ততা প্রশমিত হয় না। এবি তখন তার হৃদয়োচ্ছৃত নির্লোভ ভালোবাসার প্রমাণ দিতে তাদের মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ানো নবজাতক পুত্রসন্তানটিকে এবেনের সামনেই হত্যা করে। এতে এবেন ভীষণভাবে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। এবিকে সে আবারও অভিযুক্ত করে তার সন্তানকে হত্যার দায়ে। ছুটে যায় শেরিফের কাছে। বিচার চায়। কিন্তু পরক্ষণেই সে উপলব্ধি করে যে, সে এবিকে ভালোবাসে। বাড়ির দিকে ছোটে। এবিকে বলে, চলো আমরা পালিয়ে যাই। এবি রাজি হয় না। শেরিফ আসেন। এবেন তাঁকে বলে, এবি নয়, সে নিজেই নবজাতককে হত্যা করেছে। কিন্তু এবি তার কৃতকর্মের পরিনাম গ্রহণে দৃঢ় থাকে। ইউজিন ও’ নিলের ‘ডিজায়ার আন্ডার দ্য এলমস’ নাটকে অঙ্কিত এই যে যৌনতা এ কি কেবলই অশ্লীলতা, নাকি মানবজীবনের বাস্তবতাশ্রিত যৌন-মনস্তত্ত্বের সুগভীর অধ্যয়ন? জ্ঞানবাদ, যুক্তিবাদ ও প্রকৃতিবাদের অধিচর্চা এমন অস্বীকৃত এবং অস্বাভাবিক যৌনতাকে অনভিপ্রেত মনে করে না। বরং যাপমান জীবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাবে এমন ঘটনা কখনো কখনো সংঘটিত হতে পারে বলে স্বীকার করে।
বাংলা ভাষার আরেক শক্তিমান সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের বহুল পঠিত এবং ব্যাপক আলোচিত উপন্যাস ‘খেলারাম খেলে যা’-তেও যৌনতার নগ্ন উপস্থাপনা রয়েছে। এ উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট টেলিভিশনের তুখোড় উপস্থাপক বাবর আলী খান একেবারে নগ্ন এবং নির্লজ্জভাবে লতিফা, বাবলি, জাহেদা ও মিসেস নাফিস নামীয় কয়েকজন অল্পবয়সী নারীর সঙ্গে যথেচ্ছ যৌন-ক্রিয়ায় লিপ্ত হন। এ কারণে আপাতদৃষ্টে তাঁকে একজন স্খলিত চরিত্রের লম্পটই মনে হয়। কিন্তু তাঁর জীবনে সংঘটিত নানান ঘাতপ্রতিঘাত, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও হতাশার মূলে দৃষ্টি দিলে তাঁর এই আচরণিক ও মানসিক বিকৃতির একটি ভিত্তি পাওয়া যায়। ১৯৪৭-এর দেশবিভাগকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় স্বভূমি থেকে বিতারিত হওয়ার বেদনা, চোখের সামনে দাঙ্গাকারীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়া নিজের বোনকে উদ্ধার করতে না পারার যন্ত্রণা, ভিন্ন এক নতুন দেশে শিকড়হীন উদ্বাস্তু হওয়ার হতাশা—ইত্যাকার বিষয় তাঁকে ভীষণ মনোবৈকল্যের দিকে ঠেলে দেয়। এমনই অসাংজ্ঞিক মানসিক অস্থিরতার কবল থেকে নিষ্কৃতির লক্ষেই হয়তো তিনি সুরা ও নারীতে আশ্রয় খুঁজেছেন।
ক্রিস্টোফার মারলোর বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ‘দ্য ট্র্যাজিক স্টোরি অব ডক্টর ফস্টাস’-এর ট্র্যাজিক হিরো ডক্টর ফস্টাসকেও চূড়ান্ত মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার সময় এমন অস্বাভাবিক যৌনাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে দেখা যায়। এই নাটকের সংলাপীয় কাহিনি মোতাবেক ড. ফস্টাস তাঁর সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ পাণ্ডিত্যের অধিকারী মহান মানুষ। অঢেল সম্পদও ছিল তাঁর অধিগ্রহণে। কিন্তু তিনি তাঁর মানবীয় সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভীষণ অতৃপ্ত ছিলেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা প্রাকৃতিক ও পার্থিব স্বাভাবিকতার সীমানা অতিক্রম করে। তিনি অতিপ্রাকৃতিক দৈবশক্তির অধিকারী হতে চান। ব্ল্যাক ম্যাজিকের মাধ্যমে শয়তান-রাজ লুসিফারকে ডাকেন। তার সঙ্গে সম্পাদন করেন নিজ-রক্তে লেখা অতিশয় হটকারী বিপজ্জনক চুক্তি। চুক্তির শর্তানুযায়ী ২৪ বছরের জন্য তিনি শয়তান মেফিস্টোফিলিসকে পেয়ে যান তাঁর অনুগত কর্মকারক হিসেবে। এই শয়তানের সাহায্যে তিনি ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো গডলি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু কখনো ঈশ্বরকে স্মরণ করতে পারবেন না, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে পারবেন না এবং মেয়াদান্তে তাঁর মনুষ্যীয় পবিত্র আত্মাটি নরকের প্রধান-শয়তান লুসিফারের হাতে সমর্পণ করতে হবে।
এরপর ফস্টাস শয়তান-প্রদত্ত অতিপ্রাকৃতিক শক্তিবলে সারা পৃথিবী ঘুরতে থাকেন, অসংখ্য অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাতে থাকেন, অসংখ্য বিষয় উপভোগ করেন এবং পুরো মানবকুলকে অভিভূত করেন, বিস্মিত করেন। কিন্তু শয়তানের হাতে নিজের আত্মা তুলে দেওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে আসে; তখন তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন, চরম হতাশায় নিমজ্জিত হন। এমতাবস্থায় তিনি প্রায়শ্চিত্ত করতে চান, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে চান। কিন্তু পারেন না। এমনই এক মহামনোবৈকল্যকালে তিনি মেফিস্টোফিলিসকে আদেশ করেন বহুকাল আগে প্রয়াত বিশ্বনন্দিত প্যারাগন অব বিউটি হেলেনকে হাজির করতে। তাঁর সামনে হেলেনের ছায়া চলে আসে। সেই ছায়াকেই তিনি জড়িয়ে ধরেন, চুম্বন করেন কেবলই এক চিলতে শান্তির আশায়, এক চিলতে স্বস্তির আশায়।
আমরা এ রকম আরেক ঘটনা দেখতে পাই কেনিয়ান-আমেরিকান ঔপন্যাসিক টনি মরিসনের নোবেলজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’-এর কাহিনিতে। উপন্যাসের উপজীব্য আমেরিকার কালো মানুষদের দুঃখাক্রান্ত জীবনের দুর্বিষহ আলেখ্য। শাদা সভ্যতার এই দেশে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত নিগ্রোরা বিরামহীন লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, গঞ্জনা ও উপেক্ষার শিকার হয়। এখানে কালোদের জীবনে কোনো স্বস্তি নেই, স্বস্থতা নেই। তাদের জীবন উচ্ছিষ্টের মতো। ব্যর্থতা এবং হতাশাই তাদের জন্মগত অর্জন। এই হতাশা নিষ্ক্রমণের লক্ষ্যে কালো সমাজের অধিকাংশ মানুষ প্রায়শই নেশাদ্রব্য সেবন করে এবং অপ্রকৃতস্ত থাকে। ফলে তারা নানারকম সমাজ ও নীতিবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আচার-আচরণে আকীর্ণ হয় ভয়াবহ বিকৃতি ও অসঙ্গতি। টনি মরিসনের ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পেকোলার জন্মদাতা পিতা চোলি ব্রিডলাভ এমনই হতাশাগ্রস্ত বঞ্চিত মানুষ। তার জীবনযাপন অসংলগ্ন, চালচলন ও চরিত্র বিকৃত। কোনো একদিন সে খুবই অস্বাভাবিক মদ্যপাবস্থায় নিজগৃহে প্রবেশ করে এবং তার নিজের ঔরসজাত তেরো বছর বয়সী কন্যা পেকোলাকে ধর্ষণ করে। নীল চোখ অর্জনের স্বপ্নে মগ্ন এই সমাজ-উপেক্ষিত অতি কালো মেয়েটি তার পিতার শুক্রাণুতে অন্তঃসত্ত্বা হয়। এসব অস্বাভাবিক ও অস্বীকৃত যৌনাচার থেকে মোটামুটিভাবে একটি ধারণা জন্মায় যে, ভীষণরকমের হতাশা, অবস্থান ও অবস্থিতিগত অস্বস্থতা এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিচ্ছিন্নতাও মানুষকে অবৈধ এবং বিকৃত যৌনাচারে প্রবৃত্ত করতে পারে এবং করে।
বৃটিশ ঔপন্যাসিক ডি এইচ লরেন্স তাঁর বিশ্ববিদিত উপন্যাস ‘লেডি চ্যাটার্লি’স লাভারস’-এ দাম্পত্যিক ও অদাম্পত্যিক যৌনতার ভিন্নতর মনস্তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভাবাবহে রচিত এ উপন্যাসের আখ্যান-কারণিক চরিত্র স্যার ক্লিফোর্ড একজন অভিজাত ও জ্ঞানদীপ্ত বিদ্বান মানুষ। তাঁর দেহের নিম্নাংশ অবশ। অপরদিকে স্ত্রী কন্সট্যান্স ওরফে কনি একজন যৌবনবতী, রূপবতী ও রুচিশীল নারী। ক্লিফোর্ডের শারীরিক প্রতিবন্ধীতার কারণে তাঁদের দাম্পত্য-জীবনে যৌন-সংসর্গের বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু নিজের যৌন অক্ষমতা সত্ত্বেও ক্লিফোর্ড মনেমনে তাঁর পারিবারিক আভিজাত্যের একজন উত্তরাধিকারী কামনা করেন। এখানেই নিহিত লরেন্স প্রণীত যৌনতার সেই ভিন্নতর মনোপাঠ। সুবিশাল বাগান বেষ্টিত সুরম্য বাড়ির সুনসান পরিবেশে ক্লিফোর্ড-কনির বসবাস। তাঁরা যে যার মতো চুপচাপ। ক্লিফোর্ডের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি কনিকে নীরবে-নিঃশব্দে ভাবাতে থাকে। মনের গহীনে চারিত এবং জারিত এই নীরব ভাবনার কোনো এক অবচেতন ফাঁকে তিনি একাধিক পুরুষের বাহুলগ্না হয়ে পড়েন।
তাঁর সবশেষ শারীরিক সম্পর্ক হয় ক্লিফোর্ডের বিস্তীর্ণ বাগানবাড়ির গেইমকিপার অলিভার মেলোর্স-এর সাথে। শারীরিক সুখাস্বাদের দিক থেকে কনির কাছে এ সম্পর্কটিই সবচেয়ে উপভোগ্য হয়। তদুপরি এখানেও তিনি মানসিকভাবে অনাকৃষ্ট, অযুক্ত এবং অবসন্ন থাকেন। উপন্যাসে যৌনতার যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে মনস্তত্ত্বের পর্যবেক্ষণে তা খুবই জটিল ও রহস্যময়। এখানে এমনটি ভাবা যেতেই পারে যে, কনির পরপুরুষ-লগ্নিতায় ক্লিফোর্ডের অন্তর্ভাবনাটির প্রভাব নিতান্তই গৌণ। অথবা আদৌ কোনো প্রভাবই নেই। বরং স্বাস্থ্যবতী কনির প্রকৃতি-প্রদত্ত সহজাত মনো-দৈহিক প্রেষণাটিই এখানে মুখ্য এবং অনুপেক্ষ বিষয়। এভাবে অনুসন্ধান চালাতে থাকলে দেখা যায় প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যেও যৌন-জৈবিকতার অনিবার্যতা ব্যাপক পরিসরে অধিত এবং চর্চিত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে ইউরিপিডিস রচিত গ্রীক মিথোলজি নির্ভর বিয়োগান্তক নাকট ‘মিডিয়া’তে অস্বাভাবিক যৌনাচারের চিত্র পাওয়া যায়। এখানে দেখা যায়, দাম্পত্য-যৌনতার বাইরে পরকীয়া-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অপরাধে মিডিয়া তাঁর স্বামী জ্যাসনকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেন।
আরও পড়ুন
ডেভিড ডিওপের কবিতা / অতীত প্রীতি ও আফ্রিকানদের জাগরণের ডাক
প্রাচীন গ্রীসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার এস্কাইলুসের বিখ্যাত মেলোট্র্যাজেডি ‘আগামেমনন’র প্রধান চরিত্র স্পার্টার রাজা আগামেমনন। রাজার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রার বোন হেলেন তাঁর ভাই মেনিলসের স্ত্রী। পরকীয়া প্রেমের জেরে হেলেন ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের সাথে পালিয়ে যান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রীকরা ট্রয় আক্রমণ করেন এবং সেই যুদ্ধে অ্যাকেন যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেন দিগ্বিজয়ী বীর আগামেমনন। ভিন দ্বীপে যুদ্ধরত রাজার দীর্ঘ অনুপস্থিতির অবসরে রানী তাঁর দেবর (আগামেমননের চাচাতো ভাই) এজিসথুসের সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দশ বছর পর আগামেমনন স্পার্টাতে ফিরলে ক্লাইটেমনেস্ট্রা তাঁর নাঙ এজিসথুসকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীকে হত্যা করেন।
বিখ্যাত গ্রীক নাট্যকার সফোক্লেস রচিত নাটক এডিপাস রেক্স-এ যৌনতার ভয়াবহ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে থেবসের রাজা- রানী লেইয়াস এবং জোকাস্টার পুত্র এডিপাস পিতাকে হত্যা করে তাঁর মাকে বিয়ে করেন। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেকার এসব পৌরাণিক ঘটনার বাস্তব সংঘটন আজকের সমাজেও অহরহ প্রত্যক্ষীভূত হয়। স্বামীর শারীরিক অক্ষমতা অথবা স্বামীর প্রবাস যাপনের কারণে এখনো অসংখ্য নারীকে পরপুরুষের দেহলগ্নী হতে দেখা যায়। এমনকি স্বামী সক্ষম ও স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর চাইতে অধিক আকর্ষণীয় এবং অধিক জৌলুসপূর্ণ অন্য পুরুষে মোহিত হয়ে স্বামী ও সন্তান-সন্ততি ছেড়ে অন্য ঘরে চলে যায় অনেক নারী। কখনো কখনো যৌনতার অতি উগ্র খায়েস পূরণের পথে অন্তরায় হওয়ায় স্বামী-সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করতে দেখা যায় কাউকে কাউকে। একইভাবে ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অনেক পুরুষ পরনারীতে আসক্ত হয়ে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পছন্দের নারীর সম্মতি না থাকলেও জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যায় অনেক পুরুষকে। এসব কিন্তু সমাজেরই ছবি, জীবনেরই অভিক্ষেভ। সুতরাং কোনো সাহিত্যিক যখন সমাজের এই বিশেষ অধিক্ষেত্রটি নিয়ে কোনো সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেন; তখন যৌনতার এমন নগ্ন স্বরূপ অনিবার্য কারণেই তাঁর লেখায় চলে আসে। এবং ভুলে গেলে চলবে না যে, কাহিনির বস্তুনিষ্ঠতা এবং শিল্পের সততার প্রয়োজনেই শিল্পীকে কাজটি করতে হয়।
সাহিত্যে যৌনতাকেন্দ্রিক অশ্লীলতা প্রসঙ্গে অমীয়ভূষণ বলেছেন, ‘এটা গাইনোকলজির বিষয়, লেখকের কারবার একে ঘিরে হতে পারে না।’ অথচ তাঁর নিজের লেখা ‘বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী’র কাহিনিও কিন্তু যৌন-ঘটনার সংশ্রবমুক্ত হতে পারেনি। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় অবশ্য এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আধুনিক চিন্তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘খুন পৃথিবীর নির্বোধতম অপরাধ। খুনের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে লেখা হয় ক্রাইম স্টোরি। কেউ বাঁধা দেয় না। উল্টোদিকে, যৌনতা অপরাধ তো নয়ই, জীবনের অপরিহার্য আনন্দের বিষয়। অথচ শুধু যৌনতা নিয়ে লিখলেই মহাভারত পাপবিদ্ধ হয়’ (গদ্যসংগ্রহ ১, মার্চ ২০০৩, প্রতিভাস, পৃ-২২৪)।
সারকথা হলো যৌনতা জীবনের উৎসভূমি। এ শুধু মানবজীবনেই ক্রিয়াশীল নয়। সকল জীব ও সকল প্রাণিতেই এ এক শাশ্বত আনন্দ-খেলা। জীবনের সাথে এর চিরায়ত বন্ধন। আর সাহিত্য যেহেতু সমগ্র জীবনবিশ্বের বাস্তবাশ্রিত কল্পবোধের শিল্পচিত্র, সেহেতু যৌনতার অধ্যায়টিও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য মননপাঠ। ফলে অসংখ্য সাহিত্য-শিল্পীর সৃষ্টিকলাতে যৌনতার মনস্তাত্ত্বিক, প্রায়োগিক ও নৈয়ায়িক অধিপঠন নানা-স্বর ও নানা-ব্যঞ্জনায় উৎকীর্ণ হয়েছে। এরই সড়ক-সরণে দেখা যায় সমরেশ বসুর ‘বিবর’ ও ‘প্রজাপতি’; আর্থার মিলারের ‘অল মাই স্যনস’ ও ‘ডেথ অব এ সেলস ম্যান’; হেনরি মিলারের ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’, ‘ট্রপিক অব ক্যাপ্রিকর্ন’ ও ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকেশনের ট্রিলোজি: সেক্সাস, প্লেক্সাস ও নেক্সাস’; জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’; গুন্টার গ্রাসের ‘দ্য টিন ড্রাম’; ফিলিপ রথের ‘পোর্টনয়েস কমপ্লেইনট’ ও ‘দ্য প্রফেসর অব ডিজায়ার’; ভ্লাদিমির নবকভের ‘ললিটা’ এবং মিলান কুন্দেরার অধিকাংশ লেখাতেই যৌনতার উপস্থিতি স্পষ্ট।
অর্থাৎ পৃথিবীর অসংখ্য বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিতেই কামকলার চিত্রায়ণ ঘটেছে নানান কৌশলে, নানান ভঙ্গিমায়। তবে লক্ষণীয় যে, এঁদের লেখায় উপস্থাপিত যৌনতা কেবলই দেহগত কামাকাঙ্ক্ষার বাহ্যিক সুড়সুড়ি সৃষ্টির প্ররোচনা নয়, কেবলি রতিস্খলনের নিমিত্ত মাত্র নয়। কামচেতনা ও কামক্রিয়া সম্পর্কিত এসব ন্যারেটিভ বরং রীতিমতো শিল্প ও দর্শনঋদ্ধ। এগুলো মানুষের চিন্তাকে নাড়িয়ে দেয়, মননকে সমাহিত করে। বুঝিয়ে দেয় যে, যৌনতা একইসাথে কামতাপ প্রশমক শারীরিক, হৃদয়োদ্গত আবেগিক, মনোদ্গত প্রেমার্দ্রিক ও বোধোদ্গত চৈতনিক মিলনের বিষয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানী জিন পিয়াগেট মনে করেন, ‘নরনারীর শারীরিক মিলন শুধু যৌনচেতনার বিকাশকেন্দ্রিক নয়, এতে মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধিগত বিকাশও সম্পৃক্ত।’ যে যৌনতায় পরস্পরের স্বেচ্ছাগ্রহ এবং সচেতন মনঃসংযোগ থাকে না; বরং ইচ্ছাবিরুদ্ধ বল প্রয়োগের ঘটনা ঘটে তাকে স্বাভাবিক যৌনসঙ্গম বলা চলে না। সেটি ধর্ষণ বা বলাৎকার, সেটি বিকৃত যৌনাচার; যাকে ইংরেজিতে বলা হয় সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট। এ যৌনতাই অশ্লীল, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং ঘৃণ্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে এ জাতীয় ঘটনার উপস্থিতিও কম নয়।
সুতরাং যৌনতার এ বিশেষ দিকটিও সাহিত্যের আখ্যানিক উপসঙ্গ হিসেবে আসতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের ভেতরে একে অশ্লীল বলার অবকাশ থাকে না। কারণ এ ক্ষেত্রে এটি সন্নিবেশিত হয় ঘটনা-পরম্পরার অঙ্গ হিসেবে। পাশাপাশি এও মনে রাখা দরকার যে, জীবন-অন্বিত ভাবদর্শন ও পরিশীলিত শিল্প-নন্দন বিবর্জিত পর্নোকাহিনি কোনোভাবেই সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত নয়। এগুলো কুরুচিপূর্ণ মনোবিকারের অশ্লীল প্রকাশ। সুতরাং এ অশ্লীলতাকে সাহিত্যের অশ্লীলতা হিসেবে অভিহিত করার কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা খানিকটা জরুরি বলেই মনে হয়, তা হলো—প্রাচীন ও মধ্যযুগে নারীদেহের তথা মানবদেহের বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপের পেছনে কতগুলো সামাজিক, ঐতিহাসিক, দর্শন-তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ক্রিয়াশীল ছিল। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, সেই সময় পর্যন্ত হয়তো সৌন্দর্য সম্পর্কিত অতীন্দ্রিয়বাদী, আধ্যাত্মবাদী ও মরমি ধারণা পূর্ণরূপে বিকশিত হয়নি। এ ছাড়া সেকালের কবিসাহিত্যিকরা মূলতই রাজপৃষ্ঠপোষকতায় আশ্রিত থাকতেন। আর রাজা-বাদশারা সাধারণত নারী-সৌন্দর্য, তথা যৌনতা বিষয়ক চটুল ও রসালো কথা শুনতে বেশি পছন্দ করতেন। সুতরাং রাজতোষণার নিমিত্তেও হয়তো তখন কামাবেশের ইঙ্গিতবাহী নারীদেহের বাহ্যসৌন্দর্য চিত্রায়ণের দিকটি অধিক গুরুত্ব পেতো।
সবশেষে বলতে হয়, চলমান সমাজজীবনে যা কিছু ঘটমান; তার সবকিছুই সাহিত্যে গৃহীত, চিত্রিত এবং চর্চিত হতে পারে। এটি অস্বাভাবিকতাও নয়, অশ্লীলতাও নয়। অর্থাৎ জীবনকে অনন্তকাল ধরে প্রবহমান রেখেছে যে, যৌনতা সাহিত্যশিল্পে তার উপস্থিতি কোনোভাবেই অবাঞ্ছিত এবং নিষিদ্ধ হতে পারে না। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যস্রষ্টাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তাঁর শিল্প-প্রয়াসটি যেন জীবনবেদের সত্যলগ্ন দর্শনমুখীতায় আকীর্ণ হয়।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাবেক উপাধ্যক্ষ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
আরও পড়ুন
খৈয়াম কাদেরের কবিতা: সময় ও সভ্যতার অন্তর্চিত্র
এসইউ








