বন্যাজনিত কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও যোগাযোগব্যবস্থায় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে দেশের শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন।
সংগঠন চারটি হলো বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)।
রোববার (১২ জুলাই) বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক যৌথ সাক্ষরে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে এ চিঠি দেন।
আরও পড়ুন
ত্রাণ মন্ত্রণালয় / চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি-বন্যায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
বর্তমান সরকারের ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সহজীকরণে গৃহীত সময়োপযোগী উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে গতিশীল করেছে দাবি করে লেখা চিঠিতে, সরকারের এ নীতির ধারাবাহিকতায় চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থায় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দ্রুত নিরসন করা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ এবং পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে । এর ফলে আমদানিকৃত তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক ও প্যাকেজিং সামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য আর্দ্রতা সংবেদনশীল পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিজাত ও অন্যান্য প্রস্তুত পণ্যের শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাতিল, মূল্যছাড়, বিলম্বজনিত জরিমানা এবং ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
আরও পড়ুন
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো আপস নয়: নজরুল ইসলাম
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে পানি প্রবেশ করে পণ্যভর্তি কন্টেইনারসহ আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি অস্বীকার, বর্জন ও প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি এ বিষয়ে দায় ও জবাবদিহি গ্রহণ না করার অবস্থান জানায়।
ঠিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহৃত ভাষা ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি যদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যথায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘ সময় কনটেইনার ও পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, শেড ও ইয়ার্ড চার্জ, স্টোরেজ ব্যয় এবং শিপিং চার্জ বহন করতে হচ্ছে। কাঁচামাল সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন, প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ, শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি প্রদান, ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক দায়দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মৃত্যুরোধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি বাসদের
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অতীতে বন্যা ও অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত সময় প্রদান এবং জরিমানা সুদ ও বিলম্ব ফি আরোপ না করার মতো নীতিগত সুবিধা দিয়েছিল। একইভাবে বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডেমারেজ, স্টোরেজ, শেড, ইয়ার্ড ও সংশ্লিষ্ট চার্জে ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচিত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনুরূপ নীতিগত সহায়তা প্রদান ব্যবসা ও শিল্প খাতের ক্ষতি প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
চিঠিতে ব্যবসায়ীদের ৯ প্রস্তাব
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং শিল্প সহায়তা নীতির আলোকে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ যৌথভাবে ৯টি বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। প্রস্তাবগুলো হলো—
১. চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার প্রদান।
২. চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম হাউস, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন।
৩. বন্যা ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনার ও পণ্যের ডেমারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, স্টোরেজ, শেড, ইয়ার্ড ও সংশ্লিষ্ট শিপিং চার্জ নির্ধারিত সময়ের জন্য সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন চার্জ আরোপ স্থগিত রাখা।
৪. কাঁচামাল, রপ্তানি পণ্য, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি ও পচনশীল পণ্যের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, পরীক্ষণ, স্ক্যানিং, মূল্যায়ন ও ডেলিভারির জন্য বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু।
৫. ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পসুদের বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন এবং জরুরি কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধা চালু করা; পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সময় বৃদ্ধি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং যৌক্তিক সময়ের জন্য ঋণশ্রেণিকরণে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
৬. দুর্যোগজনিত কারণে এলসি, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, আমদানি, রপ্তানি, শিপমেন্ট এবং রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত নির্ধারিত সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি।
৭. ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল এবং কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস শুল্ক, উৎসে কর ও সরকারি ফি পরিশোধে সময় বৃদ্ধি ও বিলম্বজনিত সুদ, জরিমানা ও সারচার্জ মওকুফ।
৮. ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা তহবিল গঠন।
৯. বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বা গুণগত মান হারানো আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানি পণ্য ধংস, পুনঃরপ্তানি, প্রতিস্থাপন কিংবা পুনরায় আমদানির ক্ষেত্রে সহজতর কাস্টমস, বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান।
উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ চিঠিতে
চার ব্যবসায়ী সংগঠনের ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম হাউস, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে ।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে বন্যার্তদের পাশে সেনাবাহিনী, মানবিক সহায়তা অব্যাহত
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন শিল্প ও লজিস্টিক এলাকায় টেকসই ড্রেনেজ ও জরুরি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণ, কনটেইনার ইয়ার্ড ও সংরক্ষণাগারের উচ্চতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কোল্ড-চেইন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা বা অন্য কোনো দুর্যোগকালে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার লক্ষ্যে বিকল্প বন্দর ও পরিবহন রুট, জরুরি কাস্টমস সেবা, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন এবং ব্যবসা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘ন্যাশনাল ট্রেড কন্টিউনিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়ন করা যেতে পারে ।
জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং দেশের সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষার স্বার্থে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জরুরি ভিত্তিতে নিরূপণপূর্বক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সমন্বিত আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা এবং উপর্যুক্ত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য নৌমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা।
এমডিআইএইচ/এমএমকে








