কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং ও এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছে প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়া গ্রুপ।
একই সঙ্গে নেতৃত্ব কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নতুন নিয়োগ এবং আগামী এক বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রোববার (১২ জুলাই) ঢাকার ফোর্টিস ডাউনটাউন রিসোর্টে অনুষ্ঠিত বিটোপিয়া অ্যানুয়াল প্ল্যানিং (বিএপি) ২০২৬-২৭ সম্মেলনে এসব ঘোষণা দেওয়া হয়। দিনব্যাপী এ সম্মেলনে গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ নির্বাহী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বিভাগীয় প্রধান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এসময় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিটি ব্যবসা ইউনিটের কৌশলগত পরিকল্পনা, বার্ষিক বাজেট ও কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) অনুমোদনের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
বিটোপিয়া জানায়, ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল লক্ষ্য বাংলাদেশ থেকে একটি এআইনির্ভর বৈশ্বিক প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। এ পরিকল্পনার আওতায় সফটওয়্যার উন্নয়ন ও আইটি আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, বিজনেস অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকাসহ নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
২০১৩ সালে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মনির হোসেনের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১৭ সালে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ ও সাতজন কর্মী নিয়ে বিডিকলিং আইটি লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু হয়। এক দশকের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ২২টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিটোপিয়া গ্রুপে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে গ্রুপটির অধীনে বিটোপিয়া লিমিটেড, সফটভেন্স, স্পার্কটেক এজেন্সি, এসএম টেকনোলজি, জেভিএআই, জেনেক্সক্লাউড, ব্যাকবেঞ্চার স্টুডিও, স্কেলআপ, বিডিকলিং, পালসগ্রিড, বিডিকলিং এন্টারপ্রাইজ, ফায়ার এআই, পিক্সেলোরা স্টুডিও ও জেনকোরসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এখানে কর্মরত।
বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের গ্রাহকদের সফটওয়্যার উন্নয়ন, এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, ক্লাউড সেবা, আইটি আউটসোর্সিং, বিপিও, ডিজিটাল মার্কেটিং ও এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রুপটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি।
সম্মেলনে নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়। চেয়ারপারসন সাবিনা আক্তার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মনির হোসেনকে বিটোপিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ঘোষণা দেন। নতুন কাঠামোর আওতায় তিনি গ্রুপের কৌশল, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দেবেন।
অন্যদিকে, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম, ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জন এবং কেপিআই বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন।
নেতৃত্ব পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সফটভেন্স আইটি লিমিটেডের সিইও হিসেবে মোহাম্মদ নাসির, জেনকোর সল্যুশনস লিমিটেডের সিইও হিসেবে জিসান আহমেদ এবং বিটোপিয়া লিমিটেডের সিইও হিসেবে গৌরব কৃষ্ণ গুপ্তকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আবদুল্লাহ আল আলামিনকে বিটোপিয়া গ্রুপের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) করা হয়েছে। তিনি গ্রুপের ব্র্যান্ডিং, বিপণন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দেবেন।
সম্মেলনে আগামী এক বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এসময় ‘বিটোপিয়া সিটি’ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পের ধারণাও উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পিত এ প্রযুক্তিনগরীতে ডেটা সেন্টার, করপোরেট সদর দপ্তর, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক জিপিইউ অবকাঠামো, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিকসে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও জানানো হয়।
সম্মেলনে বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধানরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রবৃদ্ধির কৌশল এবং বাস্তবায়ন রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন। পরে অনুমোদিত পরিকল্পনা, বাজেট ও কেপিআই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিভাগীয় প্রধানদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, বিটোপিয়ার লক্ষ্য শুধু একটি সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হওয়া নয়; বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চাই, যা একদিন টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) বা ইনফোসিসের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভিশন ২০৩০’ শুধু একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নয়; এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে একটি বিশ্বমানের প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। আগামী এক বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও সেই বৃহত্তর রূপকল্পের অংশ।
সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৌশলগত পরিকল্পনা, বাজেট ও কেপিআই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিভাগীয় প্রধানদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইএআর/এমকেআর








