দেশজুড়ে টানা অতি ভারী বর্ষণে এখন পর্যন্ত ৪৩টি জেলার কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত এসব এলাকায় মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১৬ জেলার জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর। একই সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে ৫ লাখের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য।
মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে ৭৯ হাজার ৫০০ হেক্টর আউশ ধানের ক্ষেত, ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি রয়েছে।
আরও পড়ুন
বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের সব ছুটি বাতিল
বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বিকভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১৬টি জেলা হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী। এসব জেলায় মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সারাদেশে আক্রান্ত মোট ফসলি জমির ৯০ শতাংশেরও বেশি। একই সঙ্গে এসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সংখ্যা ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬ জন।
বন্যায় কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন্যার পানি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিরূপণ করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনই এখন প্রধান অগ্রাধিকার: ত্রাণমন্ত্রী
তিনি বলেন, বর্তমানে ফসলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি জমিতে নতুন করে বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানে উৎপাদিত চারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমনের বীজতলা তৈরি করা যাবে। এখনো ব্যাপক পরিসরে আমন রোপণ না হওয়ায় বড় ধরনের ফসলহানির আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
আরও পড়ুন
কৃষিমন্ত্রী / বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন বীজ-সার, গবাদিপশুর জন্য শুকনা খাদ্য
তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত বিকল্প বীজতলা তৈরির জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ক্ষতি ৪০০ কোটি
এদিকে, চলমান বন্যায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তাদের দুটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে মোট ক্ষতি হয়েছে ৩৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এসব জেলার ১৫৬টি ইউনিয়নে এক লাখ ৫৭ হাজার ৩০০টি গরু, ৪ হাজার ১৪৮টি মহিষ, এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৫টি ছাগল, ২৪ হাজার ৭৯৫টি ভেড়া, ১১ লাখ ৯১ হাজার ২০টি মুরগি এবং ২৪ হাজার ২৮টি হাঁস বন্যাকবলিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
মৌলভীবাজারে বন্যায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত
এছাড়া এসব এলাকায় এরই মধ্যে ৪৫টি গরু, ১২৩টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, এক লাখ এক হাজার ১৯৮টি মুরগি এবং এক হাজার ৫২১টি হাঁস মারা গেছে। পাশাপাশি বন্যায় ৬৫টি গবাদিপশুর খামার এবং ৬৩টি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ১১৮ টন গোখাদ্য নষ্ট হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০২টি ইউনিয়নে ১২ হাজার ৪৩ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ১৪ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি, ১৮ লাখ পোনা এবং ২৫৯ লাখ রেণু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এছাড়া নৌযানের ক্ষতি হয়েছে ১৬৭ লাখ টাকা, মাছ ধরার জালের ক্ষতি ১২৩ লাখ টাকা এবং অবকাঠামো, স্লুইসগেট, পুকুর, ঘেরসহ অন্যান্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৮২ লাখ টাকা।
এনএইচ/এমএএইচ/ এমএফএ








