ফুটবলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। কিন্তু প্রতিভাকে দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখা, চোট কাটিয়ে বারবার ফিরে আসা এবং একই ধারাবাহিকতায় পারফর্ম করে যাওয়া। এটাই একজন ফুটবলারকে আলাদা করে তোলে। স্প্যানিশ মিডফিল্ডার পেদ্রি গঞ্জালেসের গল্প ঠিক তেমনই।

কিশোর বয়সেই বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের অন্যতম ভরসার নাম হয়ে উঠেছিলেন পেদ্রি গঞ্জালেস। মাঠে তার অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা ফুটবলবিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু উজ্জ্বল এই পথচলার মাঝেই বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি। একের পর এক চোটে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো তার ক্যারিয়ারের গতি থেমে যাবে।

কিন্তু পেদ্রি হার মানেননি। বরং নিজের শরীরকে নতুন করে বুঝেছেন, বদলে ফেলেছেন খাদ্যাভ্যাস, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং জীবনযাপন। আর সেই পরিবর্তনই তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে আগের ছন্দে।

দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার

পেদ্রির বর্তমান জীবনধারার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং। বার্সেলোনার সতীর্থ ফেরান তোরেসের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করেন।

সাধারণ দিনে তিনি মাত্র দুইবার খাবার খান, দুপুরে এবং রাতে। তবে ম্যাচের দিন নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আসে। সেদিন শরীরের বাড়তি শক্তির চাহিদা মেটাতে তিনি সকালে পুষ্টিকর নাশতা করেন।

তার দৈনন্দিন অভ্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পর্যাপ্ত পানি পান। সফট ড্রিংকস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে তিনি প্রায় পুরোপুরি পানির ওপরই নির্ভর করেন।

গ্লুটেন-মুক্ত খাবারে ভরসা

বার্সেলোনার পুষ্টিবিদদের পরামর্শে পেদ্রি এখন গ্লুটেন-মুক্ত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করেন, যা শরীরের টিস্যু সুস্থ রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।

একটি খাবারের কাছে এখনও হার মানেন

এত নিয়ম মেনেও একটি খাবারের প্রতি দুর্বলতা লুকান না পেদ্রি। সেটি হলো তার মায়ের হাতে তৈরি ‘হ্যাম ক্রোকেটস’, স্পেনের জনপ্রিয় ঘরোয়া খাবার। সপ্তাহজুড়ে কঠোর ডায়েট মেনে চললেও ম্যাচ শেষে নিজেকে পুরস্কার হিসেবে মাঝে মাঝে মায়ের রান্না করা এই প্রিয় খাবারটি উপভোগ করেন তিনি। আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ছোট্ট এই আনন্দের জায়গাটি তিনি ধরে রেখেছেন।

লক্ষ্য পেশি বড় করা নয়, শক্তিশালী করা

অনেক ফুটবলার বড় পেশি গড়ার জন্য ভারী ওজন তোলেন। কিন্তু পেদ্রির পরিকল্পনা একেবারেই আলাদা। বার্সেলোনার ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুঝতে পারেন, তার শরীরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হ্যামস্ট্রিং ও পায়ের পেশি। তাই তার ট্রেনিংয়ের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে এই অংশগুলোকে আরও শক্তিশালী ও ইনজুরি-প্রতিরোধী করে তোলা। প্রতিদিনের শক্তিবর্ধক অনুশীলনের মাধ্যমে হ্যামস্ট্রিং, কাফ এবং পায়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পেশিকে আরও মজবুত করার ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাড়িতেও থামে না অনুশীলন

ক্লাবের অনুশীলন শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ নয়। সপ্তাহে তিন দিন নিজের বাড়ির জিমেও আলাদা ট্রেনিং করেন পেদ্রি। এখানেও মূল লক্ষ্য থাকে হ্যামস্ট্রিং ও কাফ পেশিকে আরও শক্তিশালী করা। গত কয়েক মৌসুমে তার ফিটনেসের উন্নতির পেছনে এই অতিরিক্ত অনুশীলনের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারী ওজন নয়, ভরসা পিলাটিসে

পেদ্রির ফিটনেস রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘পিলাটিস’ এবং ‘রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড স্ট্রেচিং’। পিলাটিস শরীরের নমনীয়তা বাড়ায়, ভারসাম্য উন্নত করে এবং দ্রুত দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড দিয়ে করা স্ট্রেচিং পেশির স্থিতিস্থাপকতা বাড়িয়ে ইনজুরির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। একজন মিডফিল্ডারের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও মুহূর্তেই দিক বদলানোর ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুশীলনগুলো সেই দক্ষতাকেই আরও ধারালো করেছে।

আধুনিক রিকভারির ভরসা হাইপারবারিক চেম্বার

শুধু অনুশীলন নয়, শরীরের পুনরুদ্ধারেও সমান গুরুত্ব দেন পেদ্রি। এই কাজে তিনি ব্যবহার করেন হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বার। বিশেষ এই প্রযুক্তিতে উচ্চচাপযুক্ত পরিবেশে শরীরে অতিরিক্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি টিস্যুর পুনর্গঠন দ্রুত করতে, প্রদাহ কমাতে এবং পেশির পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক শীর্ষ অ্যাথলেটই তাদের রিকভারি রুটিনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

প্রতিভার সঙ্গে শৃঙ্খলারও জয়

পেদ্রির গল্প শুধু একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের গল্প নয়। এটি নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে সেটিকে শক্তিতে পরিণত করার গল্প। একের পর এক ইনজুরি যখন তার ক্যারিয়ারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। তখন তিনি বুঝেছিলেন, শুধু প্রতিভা দিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিজের শরীরকে বোঝা, দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করা।

আজ মাঠে পেদ্রিকে যখন অনায়াসে প্রতিপক্ষের চাপ সামলে বল নিয়ন্ত্রণ করতে, নিখুঁত পাসে আক্রমণ গড়ে তুলতে কিংবা ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত একই গতিতে ছুটতে দেখা যায়, তখন তার পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ঘণ্টার অনুশীলন, কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ইনজুরির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই।

পেদ্রি তাই শুধু একজন দুর্দান্ত মিডফিল্ডার নন; তিনি প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং অধ্যবসায় থাকলে প্রতিকূলতাও একদিন সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম