রাজনৈতিক কোন্দলে বাড়ছে সহিংসতা ও খুনাখুনি। শাসক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ যেমন হচ্ছে, তেমনই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও নৃশংস ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, চাঁদাবাজি ও স্থাপনা দখল এবং কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এই সহিংসতা। ঢাকা ও জেলা শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের কর্মী-সমর্থকরা জড়িয়ে পড়ছে বড় সহিংসতায়।
এ বছর ৫ মাসে সারা দেশে ৩৫০টির মতো রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। শুধু বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ৯০টি সহিংস ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৮৫৩ জন আহত হয়েছেন। আগের বছর অন্তর্বর্তী সরকার আমলের তুলনায় সহিংস ঘটনার এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। গত বছর ১২ মাসে সহিংস ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪০১টি।
অধিকারসংশ্লিষ্ট এবং অপরাধ ও সমাজ গবেষকরা বলছেন, সুস্থধারার রাজনীতি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ আচরণের অভাবে সহিংসতা বাড়ছে। জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে অনীহার কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।
সমাজ ও অপরাধ গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক পদ-পদবি এবং ক্ষমতার ব্যবহার করে সুযোগ-সুবিধা নিতে গিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। যার পেশিশক্তি বেশি, তার কর্মী-সমর্থকরা অন্যায়ের পরও পার পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দলগুলোর পক্ষ থেকে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩৪৭টি। এতে ৫৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ১৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ১৫০ জন আহত হন। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের ১৩১টি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৮ জন আহত হন। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ১৩টি সহিংসতায় আহত হন ১০২ জন। বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ৩৭টি ঘটনায় ১ জন নিহত এবং ২৭০ জন আহত হন।
দেখা যায়, শুধু বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৯০টি সহিংস ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৮৫৩ জন আহত হন। এই ৫ মাসে দুর্বৃত্তদের ২৫টি হামলায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত হয়েছেন।
আসকের তথ্য বলছে, গত বছরে ৪০১টি সহিংস ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত হন। তবে এ বছর ৫ মাসে সহিংসতার মাত্রা দ্বিগুণের চেয়ে বেড়েছে। ওই সময়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৫১টি সহিংসতার ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৫০৪ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৩৬টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং আহত হন ৫৫৯ জন। বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগীদের নিজেদের ২৫৬টি সহিংসতার ঘটনায় ৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৩৪ জন আহত হন। এ সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির নেতাকর্মীদের অন্তর্কোন্দলে ৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৪ জন নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন।
২২ জুন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ছাত্রশিবিরের নেতা সাইফুল্লাহ বারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ করা হয় স্থানীয় যুবদল নেতা মোখলেসুর রহমান মুকুলের বিরুদ্ধে। ১৫ জুন রাজবাড়ীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় জামায়াত নেতা আসাদুল ইসলামকে হাত-পা বেঁধে হত্যা ও লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে স্থানীয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ৩০ মে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন জামায়াত নেতা সামিউল ইসলাম।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে সারা দেশে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতা হয়। এসব সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৫৮ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব সহিসংসতায় বিএনপি প্রায় ৯১.৭ শতাংশ বা ৫৫০টি ঘটনায় দায়ী। এছাড়া আওয়ামী লীগ প্রায় ২০.৭ শতাংশ বা ১২৪টি, জামায়াতে ইসলামী ৭.৭ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ১.২ শতাংশ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা ছিল। টিআইবি বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, পরিবহণ টার্মিনাল ও বাজার দখলের প্রতিযোগিতা, চাঁদাবাজি, নদীর বালুমহাল ও পাথর লুটপাট-নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি-মে ৫ মাসে সারা দেশে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২২১টি। জানুয়ারিতে ৩৪, ফেব্রুয়ারিতে ২৮, মার্চে ৫৬, এপ্রিলে ৪৮টি এবং মে মাসে ৫৫টি ঘটনা ঘটেছে। দেখা যায়, এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২০ জন নিহত এবং ৯১৫ জন আহত হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত ও ১৭৫ জন আহত এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও ১০০ জন আহত হন। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচনকালীন ২০৭টি সহিংসতার ঘটনায় শিশুসহ ৫ জন নিহত এবং ৭৯৪ জন আহত হয়েছেন।
এমএসএফ-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৫৯৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ হন। নিহতদের ৬৫ জন বিএনপির নেতাকর্মী। ৮ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং ১০ জন অন্যান্য পেশার লোক ছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৫৮০টি। এসব ঘটনায় ১ হাজার ৫৯১ জন নিহত এবং ৬৬ হাজার ১১৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ৫ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি সহিংসতায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১ জন, জামায়াতের ১ জন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ২ জন এবং ১ জন সাধারণ নারী। এপ্রিলে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেশি থাকলেও মে মাসে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক ছিল। এ মাসে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হন। মার্চে ১১৩টি ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জন আহত হন। সংগঠনটির মতে, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ।
জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জড়িত যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও দোষীদের কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল করিম যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীলতার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।








