গাজীপুরের শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের বারমা থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মিত সিংহশ্রী সেতু পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক এখন জনদুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সড়কের বিভিন্ন স্থানের পিচ, ইট ও সুরকি উঠে অসংখ্য বড়-বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্ত পানিতে ভরে কাদাময় হয়ে পড়ে, ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চালকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো সড়কজুড়েই ভাঙাচোড়া অংশ ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও গর্ত এতটাই গভীর যে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে গর্ত শনাক্ত করতে না পেরে অনেক চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। ফলে একদিকে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে মালবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি ও অটোরিকশার যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মিত সিংহশ্রী সেতু টোলমুক্ত হওয়ার পর থেকেই দূরপাল্লার ভারী যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। সিলেট, কিশোরগঞ্জের ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকার পণ্যবাহী ট্রাক এই সড়ককে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করছে। অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপই সড়কটির দ্রুত অবনতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

এই সড়কটি কেবল শ্রীপুরের নয়, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, নরসিংদীর মনোহরদী, গাজীপুরের কাপাসিয়া এবং শ্রীপুর উপজেলার হাজারো মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের প্রধান পথ। কাপাসিয়া উপজেলার টোক, সিংহশ্রী, রায়েদ ও বারিষাব ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। গাজীপুর জেলা শহর ও রাজধানী ঢাকায় স্বল্প সময়ে যাতায়াতের সুবিধা থাকায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন।

বরমী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুয়েল রানা ও মারিয়া আক্তার জানান, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির কোনো সংস্কার হয়নি। সিএনজি বা অটোরিকশায় চলাচলের সময় ভাঙা অংশে গাড়ি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়েই তাদের যাতায়াত করতে হয়।

শ্রীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার ও সুমাইয়া জানান, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়েই কলেজে যেতে হয়। বৃষ্টির দিনে গর্তে পানি জমে চলাচল আরো কষ্টকর হয়ে পড়ে। যানজটে আটকে থেকে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে কলেজে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী এলাকার বাসিন্দা বাবুল মিয়া বলেন, ‍“আগে এই সড়ক ভালো থাকায় অফিসে যেতে এক ঘণ্টা আগে বের হলেই যথেষ্ট ছিল। এখন সিংহশ্রী সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে বরমা পর্যন্ত ভাঙাচোড়া সড়ক অতিক্রম করতেই অনেক সময় লেগে যায়। তাই এখন তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বের হতে হয়।”

সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক কফিল উদ্দিন বলেন, “ভাঙা সড়কের কারণে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গাড়ি গ্যারেজে নিতে হচ্ছে। মেরামতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়। দ্রুত সংস্কার না হলে কয়েক দিনের মধ্যে এই সড়কে যানবাহন চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।”

অটোরিকশা চালক আবু মুসা বলেন, “সড়কের বড় বড় গর্তের কারণে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। বৃষ্টির সময় গর্ত পানির নিচে ঢেকে যাওয়ায় বিপদ আরো বেড়ে যায়। অনেক যাত্রী ঝুঁকির কারণে এই সড়ক ব্যবহার করতে চান না। প্রায়ই অটোরিকশা উল্টে যাত্রী আহত হচ্ছেন। জরুরি রোগী পরিবহনও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।”

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে, যার প্রভাব ব্যবসাতেও পড়ছে। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়বে।”

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) শ্রীপুর উপজেলা প্রকৌশলী তৌহিদ আহম্মেদ বলেন, “বরমা থেকে সিংহশ্রী সেতু পর্যন্ত সড়কটির প্রশস্তকরণ ও সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।”