বর্ষা মানেই স্বস্তির বৃষ্টি, সবুজে মোড়া প্রকৃতি আর এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে অলস দিন। তবে এই ঋতুর আরেকটি পরিচিত চিত্র হলো জলাবদ্ধতা। ঢাকাসহ দেশের অনেক শহরে ভারী বৃষ্টির পর রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় বা জরুরি কাজে বের হলে অনেক সময় সেই পানি মাড়িয়ে চলা ছাড়া উপায় থাকে না।

বর্ষার জলাবদ্ধ পানি বাইরে থেকে সাধারণ বৃষ্টির পানি মনে হয়, বাস্তবে সেটি অনেক সময় ড্রেনের ময়লা, আবর্জনা, নর্দমার পানি, পশুর বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ এবং নানা ধরনের জীবাণুর সঙ্গে মিশে থাকে। ফলে অল্প সময়ের জন্যও সেই পানির সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই বাসায় ফিরেই কয়েকটি সহজ অভ্যাস আপনাকে বর্ষাকালের অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

প্রথমেই ভালোভাবে গোসল করুন

বাসায় ফিরেই যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে গোসল করুন। বিশেষ করে পা, হাত এবং শরীরের যেসব অংশ জলাবদ্ধ পানির সংস্পর্শে এসেছে, সেগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

অনেকেই শুধু পা ধুয়ে নেন। কিন্তু পোশাক বা ত্বকের অন্য অংশেও জীবাণু লেগে থাকতে পারে। তাই সম্ভব হলে পুরো শরীর পরিষ্কার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

পায়ে কোনো কাটা বা ক্ষত আছে কি না দেখুন

বর্ষার ঘোলা পানির নিচে ভাঙা কাচ, মরিচা ধরা লোহা, পেরেক বা ধারালো বস্তু লুকিয়ে থাকতে পারে। অনেক সময় ছোট একটি কাটা দাগও চোখে পড়ে না।

বাসায় ফিরে পায়ের নিচের অংশ, গোড়ালি এবং আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। কোথাও কেটে গেলে বা ফোসকা দেখা দিলে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুনাশক লাগিয়ে রাখুন। ক্ষত গভীর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ভেজা পোশাক ও জুতা দ্রুত বদলে ফেলুন

অনেকেই বাসায় ফিরে দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় বা মোজা পরে থাকেন। এটি ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ, চুলকানি, র্যাশ এবং দুর্গন্ধের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বাসায় ফিরেই শুকনো পোশাক পরুন। ভেজা মোজা, জুতা বা স্যান্ডেল পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে তারপর আবার ব্যবহার করুন।

জুতা পরিষ্কার করাও জরুরি

জলাবদ্ধ রাস্তায় ব্যবহৃত জুতা বা স্যান্ডেলের নিচে নানা ধরনের জীবাণু আটকে থাকতে পারে। সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে জুতা ধুয়ে শুকিয়ে নিন। সম্ভব হলে জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। এতে একই জীবাণু আবার ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে।

জ্বর বা শরীর খারাপকে অবহেলা করবেন না

বর্ষাকালে দূষিত পানির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশেষ করে লেপ্টোস্পাইরোসিস, ডায়রিয়া, ত্বকের সংক্রমণসহ নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

জলাবদ্ধ পানিতে হাঁটার কয়েক দিনের মধ্যে যদি জ্বর, তীব্র পেশিতে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, চোখ লাল হওয়া, ক্ষতস্থানে লালচে ভাব বা ফোলা দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যাদের আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে ছোট একটি ক্ষত থেকেও বড় ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। এ কারণে এই ব্যক্তিদের বর্ষাকালে জলাবদ্ধ পানি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। প্রয়োজন হলে জলরোধী জুতা বা বুট ব্যবহার করা ভালো।

বর্ষায় নিরাপদ থাকার ছোট্ট কিছু অভ্যাস

* জলাবদ্ধ পানি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

* বাইরে থেকে ফিরে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ও পা ধুয়ে নিন।

* ভেজা পোশাক, মোজা ও জুতা দ্রুত বদলে ফেলুন।

* কোনো ক্ষত থাকলে তা পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।

* প্রয়োজন হলে টিটেনাস টিকা হালনাগাদ আছে কি না জেনে নিন।

* জ্বর বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বর্ষা উপভোগ করুন, তবে সচেতন থাকুন

বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করতেই পারেন, তবে নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। বাসায় ফিরে মাত্র কয়েক মিনিট সময় নিয়ে শরীর পরিষ্কার করা, পোশাক বদলানো এবং পায়ের যত্ন নেওয়ার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই আপনাকে বড় ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

মনে রাখবেন, বর্ষাকালে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সচেতনতা। একটু যত্নই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে পুরো মৌসুমজুড়ে সুস্থ রাখতে পারে।

ছবি: প্রথম আলো ও এআই