গত সপ্তাহের শেষে খাগড়াছড়ির পাহাড়ঘেরা আঁকাবাঁকা পথ ধরে নিলয় ও তাঁর বন্ধুরা মেঘের রাজ্য সাজেকে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির রূপ বদলাতে সময় লাগেনি। অঝোর ধারায় বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের মাচালং এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং সড়কের দুটি অংশ সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নিলয়ের মতো প্রায় ৬০০ পর্যটক হঠাৎ করে এই পাহাড়ি উপত্যকায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
অচেনা জায়গায় এভাবে আটকা পড়ে পর্যটকদের মনে কটেজ ভাড়া ও অবরুদ্ধ থাকার সময়সীমা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। ঠিক তখনই সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতি এক অভূতপূর্ব মানবিকতার নজির স্থাপন করে। সমিতির সভাপতি সুর্পণ দেববর্মণ ঘোষণা দেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আটকে পড়া পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো রুম ভাড়া নেওয়া হবে না। পর্যটকেরা শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির নামমাত্র খরচটুকু দিয়ে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সেখানে অবস্থান করতে পারবেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, সব পর্যটক সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে নিরাপদে আছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা প্রশাসনের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখা থেকে একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস এবং জেলায় অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন জায়গায় ভূমিধস, পাহাড়ধস ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা ও পাহাড়ি ট্রেইলসহ ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সর্বসাধারণের ভ্রমণ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই জরুরি নিষেধাজ্ঞা ও দুর্যোগের মেঘ যখন সাজেককে অন্ধকার করে রেখেছে, ঠিক তখনই স্থানীয়দের এই আতিথেয়তা পর্যটকদের মনে স্বস্তির আলো জ্বেলেছে। সেখানে আটকে পড়া এক আবেগাপ্লুত পর্যটক জানান, স্থানীয়দের এ ধরনের মহানুভবতায় তাঁদের মনে হচ্ছে, তাঁরা কোনো বিপদে নেই, বরং একটি বড় পরিবারের আশ্রয়ে আছেন। প্রকৃতির বৈরিতায় পথ রুদ্ধ হলেও মানুষের ভেতরের এই সহমর্মিতা প্রমাণ করে—দুর্যোগের চেয়ে মানুষের মানবিকতার শক্তি অনেক বেশি।







