জাপানের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি| তার উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বারবার তিনি নোবেল পুরস্কারের শর্ট লিস্টে স্থান পেলেও আলোচিত এই লেখকের ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি| দি নিউইয়র্ক টাইমস ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে| সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আরেক বিখ্যাত মার্কিন লেখক এবং দি নিউইয়র্ক টাইমসের ফিকশন এডিটর : ডবোরাহ ট্রিয়েজম্যান| সেই কথোপকথনের চুম্বক অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো— হারুকি মুরাকামি: প্রায় দশ বছর আগে আপনাকে আমি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম| এই দশ বছরে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে| উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়, আমার বয়স বেড়েছে দশ বছর| অন্তত আমার জন্য এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দিনে দিনে আমার বয়স বাড়ছে; আমি বৃদ্ধ হচ্ছি| আমার চিন্তার ধরন বদলেছে| তরুণ বয়সে যেমন ভাবতাম সেরকম নয়| এখন আমি নিজেকে ভদ্রলোক হিশেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি| আপনি হয়তো জানেন, একজন ভদ্রলোকের একজন ঔপন্যাসিক হওয়া খুব সহজ নয়| এটা অনেকটাই রাজনীতিকদের মতো, বারাক ওবামা কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প হওয়ার চেষ্টা করা| তবে আমার কাছে ভদ্রলোক ঔপন্যাসিকের একটা সংজ্ঞা আছে: প্রথমত, তিনি যে আয়কর প্রদান করেছেন সে সম্পর্কে কোনো কথা বলেন না; দ্বিতীয়ত, সে নিজের সাবেক প্রেমিকা কিংবা সাবেক স্ত্রীর সম্পর্কে কিছুই লেখেন না; তৃতীয়ত, তিনি সাহিত্য চর্চার জন্য নোবেল পুরস্কারের আশা করেন না| অতএব ডেবোরাহ, দয়া করে এই তিন বিষয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না| জিজ্ঞেস করলে আমি সমস্যায় পড়ে যাবো| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনি শুরুতেই আমার প্রশ্নের ভাণ্ডারে আঘাত হেনেছেন! আসলে আমি আলোচনা শুরু করতে চাই আপনার সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ, নতুন উপন্যাস ‘কিলিং কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে; যে উপন্যাসের এক চরিত্র— যাকে তার স্ত্রী ত্যাগ করে| তিনি শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ শিল্পী, চিত্রকরের বাড়িতে বসবাস করতেন| প্রথম যখন তিনি চিত্রকরের বাড়িতে যান, তখন যত সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে| আর সে সবের কিছু ঘটনা একটা মাটির গর্ত বা এক ধরনের শূন্য কূপ থেকে উত্থিত বলে মনে হয়| আমি ভাবছি এই উপন্যাসের এমন ভিত্তি আপনি নির্মাণ করলেন কীভাবে? হারুকি মুরাকামি: আপনি জানেন এটি একটি বৃহৎ উপন্যাস| এটি রচনা করতে আমার দেড় বছরের বেশি সময় লাগে| এটি রচনা শুরু হয়েছিলো এক কিংবা দুটো অনুচ্ছেদ দিয়ে| দুটো অনুচ্ছেদ লেখার পর তা আমি ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে দিই এবং এ লেখা সম্পর্কে আমি ভুলে যাই| এরপর সম্ভবত তিন কিংবা ছয় মাসের সময় আমার চিন্তায় এলো বিষয়টি এবং মনে হলো সেই দুই অনুচ্ছেদকে একটি উপন্যাসে রূপ দেয়া সম্ভব| যে ভাবা সেই কাজ— আমি উপন্যাসটি লিখতে শুরু করলাম| এর জন্য আমার কোনো নির্ধারিত সময় কিংবা পরিকল্পনা ছিলো না| এমনকি এর জন্য আমার কোনো স্টোরি লাইনও ছিলো না| কেবলমাত্র লিখিত দুই অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করেই লিখতে শুরু করি| গল্পটি আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে| লেখা শুরু করার সময় যদি আপনি জানেন শেষটা কী হবে— তাহলে সে উপন্যাস লেখার সময় আপনি আনন্দ পাবেন না| আপনি নিশ্চই জানেন, একজন চিত্রকর চিত্রাঙ্কনের আগে স্কেচ করে নেন— যা আমি পারি না| শুরুর সময় আমার ক্যানভাস থাকে সাদা, সেখানে আমি রঙ-তুলি ও ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনার উপন্যাসে একটা চরিত্র আছে— মুজার্ট অপেরার নায়ক ডন জিওভানি, যার থেকে উপন্যাসটি একটি আকৃতি পেতে শুরু করে| উপন্যাসের কেন্দ্রে কেনো আপনার এই ধারণা কিংবা চরিত্রের উপস্থাপন? হারুকি মুরাকামি: সচরাচর, আমি শিরোনাম ঠিক করে উপন্যাস লিখতে শুরু করি| এই উপন্যাসটি লেখার আগে আমি শিরোনাম পেলাম, ‘কিলিং কমেন্ডেটরে/— সেই সাথে লিখলাম গ্রন্থের প্রথম অনুচ্ছেদ| এরপর ভাবলাম এই শিরোনাম কিংবা লেখার প্রথম অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করে আমি কোনো গল্প লিখতে পারি| জাপানে ‘কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই| তবে সেই শিরোনামের মধ্যে আমি এক ধরনের গতি দেখতে পেয়েছি, আমি সেই গতি কিংবা শক্তিকেই গ্রহণ করেছি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: অপেরা ‘ডন জিওভানি’ কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?হারুকি মুরাকামি: চরিত্র আমার কাছে সব সময় জরুরি| আমি সাধারণত অনুকরণীয় কিছু ব্যবহার করি না| আমার লেখক জীবনে, শুধুমাত্র একবার একটি অনুকরণীয় বা অনুরূপ চরিত্র ব্যবহার করেছি— সে একজন খারাপ লোক— তাকে আমি খুব পছন্দ করি না, কেবল একবার তাকে নিয়ে আমি লিখতে চেয়েছি| এছাড়া অন্যান্য চরিত্র আমি নির্মাণ করেছি একটি আঁচড় কিংবা শূন্য থেকে| একবার আমি একটি চরিত্র নির্মাণ করলে, ছেলে কিংবা মেয়ে চরিত্র স্বাভাবিকভাবে এগুতে থাকে— আমাকে যা করতে হয় তা হলো তাদের চলাফেরা দেখা, তাদের সাথে কথা বলা এবং কাজ করা| আমি লেখক, আমি লিখছি, কিন্তু একইসাথে মনে হয় আমি উত্তেজনাপূর্ণ কোনো বই পাঠ করছি| অতএব আমি লেখা উপভোগ করি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অপেরার পাশাপাশি অন্যান্য সঙ্গীতও শোনে| প্রায়ই আপনার চরিত্রগুলো, নির্দিষ্ট ব্যান্ড কিংবা ঘরানার সঙ্গীত শোনে| এটা কি আপনাকে সহায়তা করে আবিষ্কার করতে যে, তারা কারা?হারুকি মুরাকামি: লেখার সময় আমি গান শুনি| ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গীত আমার লেখায় চলে আসে| আমি খুব একটা ভাবি না যে কোন ধরনের সঙ্গীত আমি শুনছি, গান আমার কাছে এক ধরনের খাবার, যা আমাকে লেখার শক্তি দেয়| আমি প্রায়ই সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি, বেশিরভাগ আমি আমার পছন্দের সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি— যা আমার স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: সঙ্গীত কি আপনাকে সুস্থ-সবল রাখে?হারুকি মুরাকামি: অবশ্যই, খুব সুস্থ রাখে| সঙ্গীত এবং বিড়াল— এরা আমাকে অনেক সহায়তা করেছে| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনার ক’টা বিড়াল আছে?হারুকি মুরাকামি: আমার নিজের কোনো বিড়াল নেই| আমি প্রতিদিন ভোরে বাড়ির পাশে জগিং করতে যাই, তখন আমি তিন-চারটি বিড়াল দেখি— তারা আমার বন্ধু| আমি দাঁড়াই এবং তাদের ডাকি, তারা আমার ডাক শুনে আসে— আমরা একে অপরকে খুব ভালো করে জানি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: নিউ ইয়র্কার যখন ‘কিলিং কমেন্ডেটরে’ থেকে একটি উদ্ধৃতি প্রকাশ করেছিলো তখন আমি আপনার কাজের অবাস্তব উপাদনগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম| আপনি বলেছিলেন, “যখন আমি উপন্যাস লিখি, তখন বাস্তবতা এবং অবাস্তবতা প্রাকৃতিকভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| এটা এমন না যে তেমন কিছু আমার পরিকল্পনায় ছিলো| আমি লিখতে গিয়ে তা অনুসরণ করেছি, তবে আমি চেষ্টা করি বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে বাস্তব উপায়ে| তবে অবাস্তব পৃথিবী আরো বেশি অবিচ্ছিন্নভাবে আভিভূত হতে থাকে| উপন্যাস আমার কাছে একটি আনন্দানুষ্ঠান| কেউ যদি যোগ দিতে চায় তাহলে দিতে পারে, আর যে কেউ যে কোনো সময়ে চাইলে চলেও যেতে পারে|” তাহলে আপনি কীভাবে মানুষ এবং বিষয়কে আমন্ত্রণ জানাবেন? লেখার সময় আপনি এমন একটা স্থান কোথায় পাবেন, যেখানে তারা আমন্ত্রণ ছাড়াই আসতে পারবে?হারুকি মুরাকামি: পাঠকরা আমাকে সব সময় বলে, আমার লেখার মধ্যে অবাস্তব জগত আছে— যাতে নায়ক অবাস্তব পৃথিবী থেকে ঘুরে আবার বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসে| কিন্তু আমি সব সময় বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যে কোনো সীমারেখা দেখতে পাই না| সুতরাং অনেক ক্ষেত্রে তারা মিলেমিশে একাকার| আমি মনে করি জাপানে, অন্যান্য বিশ্ব বাস্তব বিশ্বের খুব কাছাকাছি| তবে যদি আমরা মনে করি অবাস্তব পৃথিবীর দিকে যাবো, তাও কিন্তু তেমন কঠিন কিছু নয়| তবে আমি যে ধারণা অর্জন করেছি তা হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বে বাস্তবতার বাইরে যাওয়া কঠিন; সেখানে অন্য জগতে যাওয়ার জন্য আপনাকে কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে| কিন্তু জাপানে আপনি যদি সেখানে যেতে চান, যেতে পারেন সহজে| আমার গল্পে, আপনি যদি কূপের তলদেশে যান তাহলে দেখবেন ভিন্ন একটি জগৎ| অগত্যা আপনি বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যকার পার্থক্য করতে পারবেন না| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: অন্যপ্রান্ত অর্থাৎ অবাস্তব জগৎ তো অন্ধকার|হারুকি মুরাকামি: না সব সময় তা নয়| আমি মনে করি কৌতূহলের সাথে আরো বেশি কিছু করার আছে| যদি সেখানে কোনো দরজা থাকে, এবং তা আপনি খুলে যদি অন্যপ্রান্তে প্রবেশ করতে চান, আপনি পারবেন| এটা শুধুই কৌতূহল| অভ্যন্তরে কী? কী সেখানে? এই কাজটিই আমি করি প্রতিদিন| উপন্যাস লেখার সময় আমি ভোর চারটায় ঘুম থেকে জেগে, লেখার টেবিলে বসি এবং লিখতে শুরু করি| এটা বাস্তব পৃথিবীতেই ঘটছে| আমি কড়া কফি পান করি| কিন্তু আমি যখন লিখতে শুরু করি, তখন অন্য কোথাও চলে যাই| আমি দরজা খুলে সেখানে প্রবেশ করি এবং দেখি কি ঘটছে সেখানে? আমি জানি না— বা তোয়াক্কা করি না যে সেটা বাস্তব বিশ্ব নাকি অবাস্তব| আমি গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে যাই, এক ধরনের ভূগর্ভে বসে লেখায় মনোনিবেশ করি| আমি যখন সেখানে থাকি তখন, অদ্ভুত কিছুর সম্মুখীন হই| কিন্তু যখন তাদের নিজ চক্ষে দেখি, মনে হয় বাস্তব কিছু দেখছি| জানেন, যদি সেখানে কোনো অন্ধকার থাকে, সে অন্ধকার আমার কাছে আসে এবং সম্ভবত কিছু বার্তা বয়ে নিয়ে আসে| আমি সে বার্তা বোঝার চেষ্টা করি| আর সেই বিশ্বকে পুরোপুরি অবলোকন করি এবং যা দেখেছি তা বর্ণনা করে, ফিরে আসি নিজ জগতে| ফিরে আসাটা জরুরি| যদি আপনি ফিরে আসতে না পারেন তা হবে ভয়ংকর| আমি এ বিষয়ে খুবই অভ্যস্ত| আমি ফিরে আসতে পারি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনি কি সেসব বিষয় বা ঘটনা সাথে নিয়ে আসেন?হারুকি মুরাকামি: আরে না, তাহলে তো তা হবে ভয়ানক| আমি সেখানেই সব ফেলে আসি যেখানে তারা ছিলো| যখন লিখি না তখন আমি অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ| আমি প্রতিদিনের রুটিনকে খুব গুরুত্ব দিই| ঘুম থেকে প্রতিদিন ভোরে উঠে যাই| বেসবল খেলা যদি না থাকে, তাহলে আমি রাত ন’টার মধ্যেই ঘুমোতে যাই| সকালে জেগে আমি দৌড়াই কিংবা সাঁতার কাটি| হাঁটার সময় কেউ কেউ বলেন, ‘মুরাকামি তোমার সাথে দেখা হওয়াতে ভালো লাগছে|’ এতে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হয়| আমি বিশেষ কিছুই নই| সে কেন আমার সাথে দেখা করতে পেরে আনন্দিত| তবে যখন লিখতে বসি তখন আমি বিশেষ কিছু কিংবা অদ্ভুত কিছু| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনি বলেছিলেন যে, আপনার প্রথম দু’টি উপন্যাস লিখতে তেমন বেগ পেতে হয়নি| কিন্তু এরপর থেকে লিখতে গেলেই আপনি আগের মতো সহজে উপন্যাস বা গল্প লিখতে পারতেন না| কেন? কোন বিষয়টির কারণে আপনি এমন সমস্যার মুখোমুখি হতেন?হারুকি মুরাকামি: আমার প্রথম দু’টি গ্রন্থ ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ এবং ‘পিনবল ১৯৭৩’ খুব সহজেই লিখে ফেলেছিলাম| কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার পর আমি ওই গ্রন্থ দুটো বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি নি| এখনো আমি সে দুটো গ্রন্থ নিয়ে সন্তুষ্ট নই| গ্রন্থ দুটো রচনার পর আমি আরো বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠি| আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’| (আগের দুটো ছিলো নভেলা)| পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসটি রচনা শেষ করতে আমার তিন থেকে চার বছর সময় লেগেছে| আরাধ্য বসন্তের দেখা পেতে আমাকে একটি দীর্ঘ গর্ত খনন করতে হয়েছে| আমি মনে করি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’ থেকে আমার প্রকৃত লেখক সত্তার সূচনা| আমার প্রথম তিন বছরের লেখালেখিগুলো করেছিলাম যখন আমি জাজ ক্লাবের মালিক ছিলাম| আমি কাজ শেষ করতাম ভোর দুটোয় এবং লিখতে বসে যেতাম রান্নাঘরের টেবিলে— যা আমার জন্য অত্যন্ত পরিশ্রমের ছিলো| প্রথম দু’টি গ্রন্থ রচনার পর আমি জাজ ক্লাব বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম| ঠিক করলাম আমি ফুল টাইম লেখালেখি করবো| কিন্তু সে সময় জাজ ক্লাব ভালোই ব্যবসা করছিলো| বন্ধুবান্ধবরা ক্লাব বিক্রি না করার পরামর্শ দিয়েছিলো|ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: দিনের কাজ কি ছেড়ে দিয়েছিলেন?হারুকি মুরাকামি: এরপর আমি লিখি উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’| আমি একটি বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলাম| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: তো বৃহৎ গ্রন্থ রচনা কি সহজ ছিলো? নাকি সে কাজটি চ্যালেঞ্জিং ছিলো? হারুকি মুরাকামি: ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’ রচনার পর আমি উন্মাদনার মধ্যে ছিলাম| কারণ আমি জানি না পরবর্তীতে কী আছে আমার| আমি পরের দিন আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি| ফলে আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি পরবর্তীতে কী হবে| আমি পাতা ওল্টানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না| কারণ আমাকে সে পাতাগুলোয় লিখতে হবে| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনার এমন কোনো দিন এসেছিলো কি, যে নিজেই জানেন না পরবর্তীতে কী হবে| এমনকি সেদিন লেখার টেবিলে বসেও আপনি লিখতে পারেননি কিছুই| হারুকি মুরাকামি: আমার কখনো লেখালেখিতে বিরতি (রাইটার্স ব্লক) হয়নি| আমি লেখার টেবিলে বসার পর, প্রাকৃতিকভাবেই বলতে পারি পরে কী হবে| আমি যদি নিজে থেকেই মনে করি যে লিখবো না, লিখবো না| বিভিন্ন ম্যাগাজিন থেকে আমাকে প্রায়ই লেখার জন্য তাগাদা দেয়, আমি লিখি না| না বলে দিই| আমি নিজের ইচ্ছেতেই লিখি, পছন্দের বিষয়ে লিখি| আমি এভাবেই লিখতে পছন্দ করি| ডেবোরাহ ট্রিয়েজম্যান: আপনি কি ঘুমের মধ্যেই গল্পের প্লট তৈরি করেন?
হারুকি মুরাকামি: না| আমি তা মনে করি না| আমি স্বপ্ন দেখি না| গল্প তো গল্পই আর স্বপ্ন তো স্বপ্নই| আমার কাছে লেখালেখি স্বপ্নে দেখার মতোই| আমি যখন লিখতে বসি, তখন ইচ্ছে করে স্বপ্ন দেখি| আমি লেখা শুরু করতে পারি, আবার থামিয়ে দিতে পারি, আবার ইচ্ছে করলে পরের দিন পর্যন্ত লেখা জারি রাখতে পারি| আপনি যখন ঘুমান এবং স্বপ্নে দেখেন যে একখণ্ড মাংস (স্টেক) খাচ্ছেন, অথবা পান করছেন উপাদেয় পানীয় কিংবা স্বপ্ন দেখছেন একজন সুন্দরী রমণীকে, ঘুম থেকে ওঠার পর সবই উধাও হয়ে যায়| কিন্তু আমি লেখার টেবিলে বসে যে স্বপ্ন দেখি তার ফলে ইচ্ছে করলে পরের দিন পর্যন্ত লেখা জারি রাখতে পারি|








