বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমকালীন প্রবন্ধধারায় হায়াৎ মামুদ এক উজ্জ্বল নাম| তিনি প্রাবন্ধিক-অনুবাদক-গবেষক-শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত| বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বুকে লালন করা ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে জাগ্রত রাখা আমাদের ˆনতিকতার নিদর্শন| মানবতাবাদ-যুক্তিবাদ-অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার প্রধান ভিত্তি| হায়াৎ মামুদের বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধসমূহ বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে|সংস্কৃতি একটি জাতির সামষ্টিক জীবনবোধ-মূল্যবোধ-বিশ্বাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সাহিত্য-ভাষা-আচরণ ও জীবনচর্চার সম্মিলিত প্রকাশ| একটি জাতির পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য মূলত তার সংস্কৃতির মধ্যেই প্রতিফলিত হয়| কিন্তু বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ভোগবাদী মানসিকতা এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে সমকালীন সমাজে সংস্কৃতি নানা ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে| বিশেষ করে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়-ঐতিহ্যচর্চা-মূল্যবোধকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে| এ বাস্তবতায় সংস্কৃতির প্রকৃত অর্থ-সংকটের কারণ তথাকথিত অপসংস্কৃতির ধারণা ও সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন হায়াৎ মামুদ| বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সংস্কৃতিবিষয়ক প্রবন্ধগুলো পরবর্তীকালে ‘সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর’ গ্রন্থকারে সংকলিত হয়ে গণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ১৪১৯ বঙ্গাব্দে| এসব প্রবন্ধে সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর মননশীল বিশ্লেষণ সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অনুধাবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে|বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে| বিশ্বায়নের প্রভাবে সাংস্কৃতিক বিনিময় যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণও সমাজে দৃশ্যমান হয়েছে| এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব সংস্কৃতির পরিবর্তে বাহ্যিক অনুকরণই আধুনিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে| শিক্ষিত হওয়া এবং সংস্কৃতিবান হওয়া যে এক নয়, এ সত্যটি ক্রমেই বিস্মৃত হচ্ছে| সংস্কৃতির পরিবর্তে অপসংস্কৃতির চর্চাকে অনেক সময় অভিনবত্বের পরিচায়ক মনে করা হচ্ছে| বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় হায়াৎ মামুদের সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক|অপসংস্কৃতির ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘নিজস্ব সংস্কৃতিতে বহিরাগত সংস্কৃতির অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশ বাহ্যত দৃষ্টিগ্রাহ্য যে সকল কর্মপ্রবর্তনায় রূপায়িত হয় সেগুলোকেই আমরা অপসংস্কৃতি হিসেবে নির্ধারণ করি’ (সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর)| এখানে তিনি স্পষ্ট করেছেন, সব বিদেশি সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি নয়| অপসংস্কৃতি হল সেরকমই সাংস্কৃতিক প্রভাব একটি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য-ঐতিহ্য-মানবিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করে| বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়ন-গণমাধ্যম-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ-ভোগবাদী জীবনদৃষ্টি এবং দেশীয় ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতির প্রবণতা এ ধারণার বাস্তব প্রতিফলন| তবে হায়াৎ মামুদ বিদেশি সংস্কৃতিকে একবারে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেননি; তিনি কেবল সেসব উপাদানগুলোর বিরোধিতা করেছেন, যা জাতীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী|অপসংস্কৃতির ধারণা ব্যাখ্যার পর হায়াৎ মামুদ সংস্কৃতির সংকটের উৎস সম্পর্কেও সুস্পষ্ট মত প্রকাশ করেছেন| তাঁর ভাষায়, ‘সংস্কৃতির সংকট শুরু হয় তখনই যখন আমরা নিজের সংস্কৃতিকাঠামোকে বিবেচনার মধ্যে না এনে অন্যের সংস্কৃতি-উপাদান তার মধ্যে মেশাতে চাই’ (সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর)| এ বক্তব্যে তিনি সাংস্কৃতিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে বহিরাগত সংস্কৃতির অস্তিত্বকেই দায়ী করেননি, এরসঙ্গে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করে বিদেশি উপাদানের অচিন্তিত গ্রহণকে সংকটের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তাঁর মতে সাংস্কৃতিক বিনিময় একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া; তবে সে বিনিময় তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা নিজস্ব ঐতিহ্য-ইতিহাস-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে| অন্যথায় সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জাতীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয়|সংস্কৃতির মৌলিক স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি হচ্ছে ঐতিহ্যপরম্পরা, উত্তরাধিকারস্রোত’ (সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর) এ সংজ্ঞার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তিনি একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন| ভাষা-সাহিত্য-শিল্প-জীবনবোধ-সামাজিক রীতি ও মূল্যবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, তারই সম্মিলিত রূপ সংস্কৃতি| এ কারণেই তিনি আরও বলেন, ‘ঐতিহ্যপরম্পরা ও উত্তরাধিকার ধারাকে আশ্রয় করেই সংস্কৃতি নির্মিত হয়, বিকশিত হয়’| সংস্কৃতির বিকাশকে আমরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি না| এটি অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র| ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই একটি জাতি তার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সুদৃঢ় করতে পারে| ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন, ‘আমার ঐতিহ্য ও ইতিহাসধারার স্বাভাবিক লালনকে যে আধুনিকতা ধ্বংস করতে চায় তা আধুনিকশ্রেষ্ঠ হলেও আমি তাঁকে ভয় পাই; জানি, আমার মৃত্যুবীজ, তাতেই লুকানো আছে’ (সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর)| তাঁর আলোচনায় লালনের জীবনদর্শন ও চর্চা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে| লালনের মানবতাবাদ-অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং লোক-ঐতিহ্যনির্ভর দর্শন বাঙালির সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে| তাই আধুনিকতার নামে এ ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংকটকে আরও গভীর করে| তাঁর দৃষ্টিতে প্রকৃত আধুনিকতা ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে না; ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই নতুন সময়ের সঙ্গে সৃজনশীল সমন্বয় সাধন করে| হায়াৎ মামুদ সাংস্কৃতিক সংকটের গভীরতর কারণও বিশ্লেষণ করেছেন| তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের বর্তমান সংস্কৃতিসংকটে মূল এক জায়গায় বাঁধা, এবং তা এই যে, আমাদের আত্মশ্রদ্ধা নেই, আমাদের ইতিহাসজ্ঞান নেই, আমাদের দেশপ্রেম নেই| আমাদের সংকট প্রতি মুহূর্তে প্রকটিত হচ্ছে অন্যের সাংস্কৃতিক দাসত্ব মেনে নেওয়ার মধ্যে’| (সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর) সাংস্কৃতিক সংকটের উৎস জাতির অভ্যন্তরীণ মানসিক ও ঐতিহাসিক দুর্বলতা| আত্মশ্রদ্ধার অভাব-ইতিহাসচেতনার দুর্বলতা এবং দেশপ্রেমের অবক্ষয় মানুষকে সাংস্কৃতিকভাবে পরনির্ভরশীল করে তোলে| এর ফলে নিজস্ব ঐতিহ্যের মূল্যায়নের পরিবর্তে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে এবং সাংস্কৃতিক দাসত্বের জন্ম দেয়| এ সাংস্কৃতিক দাসত্ব কেবল পোশাক বা আচরণের অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়| এর মাধ্যমে চিন্তা-রুচি-মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শনের পরনির্ভরশীলতারও বহিঃপ্রকাশ|ন্বহায়াৎ মামুদের দৃষ্টিতে সংস্কৃতির সংকট থেকে উত্তরণের পথ নিহিত রয়েছে আত্মপরিচয়ের আবিষ্কারে| জাতীয় ইতিহাসচেতনা-আত্মশ্রদ্ধা-দেশপ্রেম-ঐতিহ্যচর্চা-সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার প্রতি দায়বদ্ধতাই একটি জাতিকে সাংস্কৃতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পারে| তার মতে, বিশ্বসংস্কৃতির ইতিবাচক উপাদান গ্রহণের পাশাপাশি নিজস্ব ঐতিহ্য-ভাষা-সাহিত্য-লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চার মধ্য দিয়েই সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্ভব| হায়াৎ মামুদের সংস্কৃতিচিন্তা সাংস্কৃতিক সংকটের বিশ্লেষণকে উন্মোচন করে এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনের একটি সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক আহ্বান|হায়াৎ মামুদের সংস্কৃতিচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়-ইতিহাসচেতনা এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়| ‘সংস্কৃতি ও প্রসঙ্গান্তর’-গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক সংকটের প্রধান কারণ বহিরাগত সংস্কৃতি নয়, আত্মশ্রদ্ধার অভাব, ইতিহাস বিস্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরনির্ভরশীলতা| তাঁর মতে, বিশ্বসংস্কৃতির ইতিবাচক উপাদান গ্রহণের পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা-ঐতিহ্য-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চার মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব| এ দৃষ্টিকোণ থেকে হায়াৎ মামুদের সংস্কৃতিচিন্তা সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে|শুধু সংস্কৃতির উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, জন্মের দায়-বাঙালিত্বের মৌলিকত্বকে ধারণ করেই তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন| তিনি এদেশের পথপ্রর্দশক| আমরা জানি অভিভাবকরা কালের রেখার পরিমাপ করে মননে ও মগজে| আর আমরা উত্তরসূরি হয়ে সে দায়িত্বটুকু যদি যথাযথ পালন করি, তাহলে বাঙলি জাতির বাঙালিত্ব-সংস্কৃতির যোগসাজস সৃষ্টি— সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষা— সংস্কৃতির ভাঙা সেতুকে মেরামত করতে পারব|
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, গত ২ জুলাই ২০২৬ হায়াৎ স্যারের ৮৭ বছর পূর্ণ হয়েছে| তাঁর ৮৭তম জন্মেদিনে স্যারকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে শুধুু এতটুকু বলতে পারি, তিনি দেশভাগ-বায়ান্নর-ভাষা আন্দোলন-মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষদর্শী মানব| তাঁর চোখের সামনে সংস্কৃতির উত্থান-পতন ঘটেছে| আবার তিনিই দেখেছেন কীভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতি গিলে খেতে বসেছে আমাদের বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল উপাদানের ভেতর কৃমির মত| তাই তাঁদের যেকোনো রচনা আমাদের জন্যে চিন্তা ও চর্চার পাশাপাশি মহাকালের দলিল হিসেবে থেকে যায়| বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদক লাভ করেন| এ সম্মাননাগুলো তাঁর সাহিত্যকীর্তি ও সাংস্কৃতিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বহন করে|








