কিং কোবরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, কালকেউটে, পদ্মগোমা, সাদা গোমা, বিষঝুড়ি, পাইথন ও দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শ সাপ রয়েছে। এটি কোনো জঙ্গলের চিত্র নয়, পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে খামারের চিত্র। এই খামার থেকে সংগ্রহ করা হবে সাপের বিষ। তা থেকে তৈরি হবে অ্যান্টিভেনম।
২০০০ সালে আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেন স্নেক ভেনম ফার্মটি। দীর্ঘ ২৬ বছর নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে খামারটি। ফলে বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার সরেজমিনে রাজ্জাক বিশ্বাসের খামারে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপত্তাবেষ্টিত খাঁচাগুলোতে রাখা হয়েছে বিষধর প্রায় আড়াই শ সাপ। প্রতিটি খাঁচার সামনে রয়েছে পরিচিতিমূলক তথ্য। খামারের কর্মীরা নিয়মিত সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন।
খামারের প্রতিষ্ঠাতা রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন সৌদি আরবে প্রবাসজীবন কাটানোর সময়ই তাঁর মাথায় সাপের খামার গড়ে তোলার ধারণা আসে। দেশে ফিরে ২০০০ সালে নিজ বাড়ির সামনে একটি গোখরা সাপ ও ২০টি ডিম দিয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ২৫০টিরও বেশি বিষধর ও অবিষধর সাপ রয়েছে। এ ছাড়া টানা ২৬ বছর ধরে খামার পরিচালনা করলেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেশের অনুমোদিত সাপের খামার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দীর্ঘ সময়ে প্রবাসে উপার্জিত অর্থ এবং বাবার সম্পদ বিক্রি করে খামারের পেছনে ১ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছেন।
রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে। অবশেষে অনুমোদন মিললেও বর্তমানে সরকারিভাবে কোনো আর্থিক বা কারিগরি সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এই উদ্যোগ এখন আর্থিক সংকটেও রয়েছে। খামার পরিচালনা, সাপের পরিচর্যা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য ব্যয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তা।
খামারটির উদ্যোক্তা জানান, প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধশিল্পে ব্যবহার করতে হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ওষুধ কোম্পানি এখনো এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যাবে না। নির্ধারিত মান ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও প্রতিবছর হাজারো মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে উপকূল ও গ্রামীণ এলাকায়।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে একটি অনুমোদিত সাপের খামার রয়েছে, যেখানে সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে সেই বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো। এ কারণে দেশের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে এ খাতে এগিয়ে আসতে হবে।’ সিভিল সার্জন বলেন, ‘সাপের খামার কর্তৃপক্ষ যদি আমার কাছে আবেদন করেন, তাহলে আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।’
এই খামার নিয়ে কথা হয় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম হেমায়েত জাহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের বিষ (ভেনম) সংগ্রহের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশে উৎপাদিত ভেনমের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে।’








