গরমে স্বস্তি দিতে ঘরে ঘরে চলছে এয়ার কন্ডিশনার বা এসি। কিন্তু এই যন্ত্রটি শুধু ঘর ঠান্ডাই করে না প্রতিটি ১.৫ টনের এসি ঘণ্টায় প্রায় ১ থেকে ২ লিটার পানি বাতাস থেকে শুষে নেয়। যা কনডেনসেট হিসেবে বাইরে ফেলে দেয়। এই পানি কোথায় যাচ্ছে? বায়ুমণ্ডলে কী প্রভাব পড়ছে? আর বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি এসির কার্বন পদচিহ্নই বা কতটুকু সেই অজানা তথ্যচিত্র তুলে ধরা হবে প্রতিবেদনে।এসি কীভাবে পানি টানে: এয়ার কন্ডিশনারের ভেতরে থাকা ইভাপোরেটর কয়েলের তাপমাত্রা বাইরের বাতাসের ডিউপয়েন্টের নিচে নেমে যায়। ফলে বাতাসের জলীয় বাষ্প কয়েলের গায়ে ঘনীভূত হয়।তরল পানি হিসেবে ঝরে পড়ে।যা কনডেনসেট নামে পরিচিত। এই পানি একটি পাইপের মাধ্যমে বাইরে নিষ্কাশিত হয়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে উচ্চ আর্দ্রতায় একটি ১.৫ টনের এসি প্রতি ঘণ্টায় ১ থেকে ২ লিটার পানি নিঃসরণ করে। অর্থাৎ দিনে ৮ ঘণ্টা চললে তা প্রায় ৮ থেকে ১৬ লিটার।হাইড্রোজেন-অক্সিজেনের ওপর প্রভাব: অনেকে প্রশ্ন করেন এই পানি বের হয়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে কি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন কমে যাচ্ছে? উত্তর হলো-সরাসরি না। কারণ এসি বায়ুর অণু ভেঙে আলাদাভাবে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বের করে না। এটি কেবল বাতাসে ভাসমান জলীয় বাষ্প ঘনীভূত করে তরল পানিতে পরিণত করে।তবে পরোক্ষ প্রভাব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্থানীয়ভাবে বায়ুর আর্দ্রতা কমে গেলে কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, শহরের মাইক্রোক্লাইমেটে পরিবর্তন আসতে পারে। গাছপালার প্রাকৃতিক আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। আর ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা হ্রাস পেতে পারে।বলা ভালো যে, পৃথিবীর পানিচক্রে বায়ুমণ্ডলে মোট জলীয় বাষ্পের পরিমাণ প্রায় ১২,৯০০ ট্রিলিয়ন লিটার। এসির প্রভাব বৈশ্বিক স্কেলে নগণ্য হলেও, ঘনবসতিপূর্ণ শহরে স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে।তথ্যছক: একটি ১.৫ টন এসির পানি নিঃসরণ হিসাব ধরলে প্রতি ঘণ্টায় তা ১–২ লিটার। একেকটা এসি দিনে ৮ ঘণ্টা চললে নিঃসরণ হয় ৮–১৬ লিটার পানি। যা মাসে ২৪০–৪৮০ লিটার আর এক মৌসুমে (৫ মাস) তা গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ লিটারে। কনডেনসেট পানি কি পুনর্ব্যবহার করা যায়? হ্যাঁ। আর এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এসির কনডেনসেট পানি মূলত পাতিত পানির মতো। খনিজমুক্ত আর অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ। তবে পাইপ বা জলাধারে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। তাই সঠিক সংগ্রহ ও পরিশোধনের মাধ্যমে এই পানি ব্যবহার করা সম্ভব।কনডেনসেট পানি গাছে সেচ দেওয়া, টয়লেট ফ্লাশ করা, মেঝে মোছা ও পরিষ্কারের কাজ, গাড়ি ধোয়া, শিল্পকারখানায় কুলিং টাওয়ারে সরবরাহ, ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহার (ডিমিনার্যালাইজড প্রয়োজনীয় স্থানে) করা সম্ভব। সিঙ্গাপুর, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মতো পানি-সংকটপ্রবণ দেশে এসি কনডেনসেট পানি পুনর্ব্যবহারের পাইলট প্রকল্প ইতোমধ্যে চলছে। দুবাইয়ের একটি বাণিজ্যিক ভবনে এসি কনডেনসেট সংগ্রহ করে বার্ষিক লক্ষাধিক লিটার পানি সাশ্রয়ের নজির রয়েছে।বিশ্বজুড়ে কতটা পানি নষ্ট হচ্ছে: আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটির বেশি এসি ইউনিট সচল ছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৫৬০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।একটি হিসাবে দেখা যায়, যদি বিশ্বের মাত্র ৫০ কোটি এসি দিনে গড়ে ১০ লিটার পানি নিঃসরণ করে, তাহলে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৫০০ কোটি লিটার পানি অর্থাৎ ৫০ লক্ষ টন। বছরে এই পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন লিটারে। যা বাংলাদেশের মতো একটি দেশের কয়েক বছরের সুপেয় পানির চাহিদার সমান।বাংলাদেশের পরিস্থিতি: বাংলাদেশ শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখের বেশি এসি ইউনিট চালু রয়েছে। গরম মৌসুমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহরে প্রায় ৮০ শতাংশ এসি দিনে গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা চলে।এই হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিদিন এসি থেকে প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি লিটার পানি নষ্ট হচ্ছে, যার প্রায় সবটাই ড্রেনে চলে যাচ্ছে। যদি এই পানির মাত্র ৩০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা যেত, তাহলে প্রতিদিন দেড় কোটি থেকে দুই কোটি লিটার পানি সাশ্রয় হতো — যা রাজধানীর বস্তি এলাকার লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সরবরাহ করতে পারত।কার্বন নিঃসরণে মহাবিপদ: এসির পরিবেশগত সংকট শুধু পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসির বিদ্যুৎ খরচ ও রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস মিলিয়ে এটি অন্যতম প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী যন্ত্র হয়ে উঠছে।আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ শুধু এসি ও কুলিং সিস্টেমে ব্যয় হয়। ২০৫০ সালে এই হার ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ দুষ্টচক্র তৈরি করবে: বেশি গরম থেকে বেশি বেশি এসি ব্যবহার করা হয়। এতে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। বেশি কার্বনের কারণে গরম আরও বাড়ে।
রাজনীতি
বাতাস থেকে এসির পানি ‘চুরি’ কতটা বিপজ্জনক

শেয়ার করুন







