এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর দাদা-দাদির কাছে বড় হয় আকাশ ইসলাম। এরপর মা ছেড়ে যাওয়ায় চার বছর বয়সে ২০০৭ সালের অক্টোবরে ফুফা তাকে কুষ্টিয়া শিশু পরিবারে (বালক) ভর্তি করে দেন। ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে এখন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত আকাশ।

তবে আকাশের চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। এর কারণ ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় কদিন আগেই তাকেসহ পাঁচজনকে প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশনার পর সোমবার (১৩ জুলাই) ওই পাঁচ কিশোরকেই শিশু পরিবার ছেড়ে যেতে হয়েছে।

‘আমার মা ভাই-ভাবির সঙ্গে শহরের হাউজিং এলাকায় সরকারি জায়গায় বসবাস করে। আমার ভাইয়ের সংসারই ঠিকমতো চলে না, তার ওপর মা থাকে। আমি কীভাবে সেখানে গিয়ে উঠবো?’

আরও পড়ুন

শিশু পরিবারের এতিম-কন্যার বিয়ে, অভিভাবক জেলা প্রশাসক

আকাশের দাদা মারা গেছেন। দাদি জীবিত আছেন তবে অসুস্থ। বেশিরভাগ সময় ফুফু বাড়ি থাকেন। এজন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আপাতত সেখানে গিয়েই উঠবেন।

আকাশ ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম লাহিনীপাড়ার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে।

আরও পড়ুন

ফরিদপুর / সরকারি শিশু পরিবারে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, ৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী বরখাস্ত

জীবনের গল্পটা এক না হলেও অনেকটাই কাছাকাছি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা একই এলাকার আকাশ শেখেরও। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর দরিদ্রতার কারণে তাকে দুঃসম্পর্কের নানা শিশু পরিবারে রেখে যান। ২০২১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। আগামী ২৭ জুলাই তারও প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে।

‘নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। তাই তাদের শিশু পরিবার ছাড়তে হবে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে তারা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে’

বয়স ১৮, তাই মিলল ‘বিদায়পত্র’
কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারের (বালক) উপ-তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়/ছবি-জাগো নিউজ

পরীক্ষার ঠিক আগে কোথায় যাবেন, কীভাবে পড়াশোনা করবেন তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আকাশ শেখ। তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সংসারে মা ও বড় ভাই আছেন। ভাই ভাঙারি ব্যবসা করে কোনো রকমে সংসার চালান। এ অবস্থায় নিজের পড়াশোনা ও ভবিষ্যত নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে আকাশ শেখের।

আরও পড়ুন

বিতর্কিত কম্পাউন্ডার / সরকারি শিশু পরিবারে রাতে নিবাসীদের ভিডিও করেন সমাজসেবার ডিডি

তাদের দুজনের মতো শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা তুষার আহাম্মেদ, আলফাজ হোসেন ও অভি হাসানের বয়সও ১৮ বছর পার হয়েছে। ১৮ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় তারাও প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে, পারিবারিক অভাব, স্বজনদের অক্ষমতা কিংবা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের মতো নানা কারণে তারা সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় সেখানে থেকেই এতদিন তারা পড়াশোনা চালিয়ে আসছিলেন। তবে আশ্রয় হারানোয় দিশেহারা এই পাঁচ শিক্ষার্থী। পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন আলফাজ হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে, ‌‘বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর ২০১২ সালে শিশু পরিবারে আমাকে ভর্তি করা হয়। আর্থিক অভাবে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও বর্তমানে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছি। আমাকে রাখার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করতে পারতাম।’

আরও পড়ুন

সমাজসেবার সহায়তা / টাকা পাওয়ার আগেই মারা যান রোগী

তিনি বলেন, ‘আমার মা ভাই-ভাবির সঙ্গে শহরের হাউজিং এলাকায় সরকারি জায়গায় বসবাস করে। আমার ভাইয়ের সংসারই ঠিকমতো চলে না, তার ওপর মা থাকে। আমি কীভাবে সেখানে গিয়ে উঠবো?’

‘কর্তৃপক্ষের হাত-পায়ে ধরেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এখন কী করবো, কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না’—বলছিলেন আলফাজ হোসেন।

তুষার আহাম্মেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পাই। সামনের বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবো। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নিতে চাই। কিন্তু এখন আশ্রয় হারিয়ে শঙ্কায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানে থাকার সুযোগ না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

অভি হাসানও একই ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরে জানান, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তার পক্ষেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

‘সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পাই। সামনের বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবো। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নিতে চাই। কিন্তু এখন আশ্রয় হারিয়ে শঙ্কায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানে থাকার সুযোগ না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে’

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে যায় না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয় হারালে তাদের শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

নাম-পরিচয়হীন শিশুর অভিভাবকত্ব দিতে হচ্ছে আইন

কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারের (বালক) দায়িত্বপ্রাপ্ত হল সুপার ও অতিরিক্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আলী জানান, ১৮ বছরে পা রাখায় সোমবার তাদের পাঁচজনকেই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী। অভি নামের একজনের বাড়ি পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহে। আলফাজ হোসেন নামের অপর শিক্ষার্থীর বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায়।

বয়স ১৮, তাই মিলল ‘বিদায়পত্র’

এদের মধ্যে দুজনকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এককালীন ৩০ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়া অভিকে দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি।

জানতে চাইলে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। তাই তাদের শিশু পরিবার ছাড়তে হবে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে তারা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘এ পাঁচজনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি। তারা যাতে সাময়িকভাবে সমস্যায় না পড়েন, সেজন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্যও সহযোগিতা করা হবে।’

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ-বিন হাসান বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। এরইমধ্যে ওই পাঁচ শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে কীভাবে-কতটুকু সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়ে কাজ চলছে।’

এসআর/জেআইএম