ছোটবেলায় বা কলেজ জীবনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করাই ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিটা বদলে যায়। কর্মজীবনের ব্যস্ততা, সংসারের দায়িত্ব, সন্তান, ক্যারিয়ারে নিয়ে অনেকের জীবন এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। একসময় যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো, এখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকে জন্মদিন বা নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তায়।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনকেই বলছেন ‘ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন’-অর্থাৎ এমন একটি সামাজিক পরিস্থিতি, যেখানে মানুষের জীবনে ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বন্ধুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যায়।
কী এই ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন?
সহজভাবে বলতে গেলে, ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন হলো এমন একটি অবস্থা, যখন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে এমন বন্ধু কমে যায়, যার সঙ্গে নির্দ্বিধায় সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, আগের তুলনায় এখন অনেক মানুষের জীবনে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বা খুব কাছের বন্ধুর সংখ্যা কমে এসেছে। এমনকি অনেকেই স্বীকার করেন, তাদের মনের কথা খোলামেলা বলার মতো একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও নেই।
কেন কমে যাচ্ছে বন্ধুত্ব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো কর্মব্যস্ত জীবন। সপ্তাহে দীর্ঘ সময় অফিস করা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বাড়ি ফিরে আবার ল্যাপটপে কাজ-এসবের মধ্যে বন্ধুত্বের জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বও একটি বড় কারণ। বিয়ে, সন্তান, পরিবারের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চাপ অনেকের সামাজিক জীবনকে সীমিত করে দেয়। ফলে বন্ধুরা ধীরে ধীরে জীবনের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে পিছিয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন। এখন অবসর সময়ের বড় একটি অংশ কেটে যায় স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া বা ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। ফলে বাস্তবে মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে।
অনলাইন যোগাযোগ কি যথেষ্ট?
বর্তমানে অনেকের বন্ধুত্বই সীমাবদ্ধ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইন যোগাযোগ কখনোই সামনাসামনি দেখা করার সুযোগ থাকে না।
বন্ধুর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলা, একসঙ্গে হাসাহাসি করা বা কেবল পাশে বসে সময় কাটানো আমাদের শরীরে অক্সিটোসিনের মতো হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং আবেগীয় বন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু টেক্সট মেসেজ বা ইমোজি সেই অনুভূতির বিকল্প হতে পারে না।
একাকিত্বের প্রভাব কতটা?
দীর্ঘদিন সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় থাকলে শুধু মন নয়, শরীরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক সময় একা থাকতে থাকতে মানুষ নতুন সম্পর্ক গড়তেও অনীহা অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে নিজেকে সমাজ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তাই বন্ধুত্ব শুধু আনন্দের জন্য নয়, সুস্থ মানসিক ও শারীরিক জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
বাবা-মায়ের বয়স বাড়তে দেখলে মন খারাপ হয় কেন?
যেভাবে টিকিয়ে রাখবেন বন্ধুত্ব
ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও সচেতনভাবে বন্ধুত্বের জন্য সময় বের করা সম্ভব। মাসে অন্তত একদিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করুন। সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত একবার ফোনে কথা বলুন।
হঠাৎ কোনো পুরোনো ছবি, গান বা স্মৃতি মনে পড়লে বন্ধুকে একটি ছোট বার্তা পাঠাতে পারেন—‘আজ হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ল।’
শুধু নিজের কথা নয়, বন্ধুর কথাও মন দিয়ে শুনুন। তার কাজ, পরিবার বা মানসিক অবস্থার খোঁজ নিন। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগই সবচেয়ে বড় বিষয়।
আরও পড়ুন
কিছু কেনার পর কেন মনে হয় ‘ঠকে গেছি’?
বন্ধুত্বের জন্য সব সময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। একটি আন্তরিক ফোনকল, ছোট্ট একটি বার্তা কিংবা এক কাপ চায়ের আড্ডাও বহু বছরের সম্পর্ককে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। ব্যস্ততার এই সময়ে তাই কাজের পাশাপাশি বন্ধুত্বের জন্যও একটু সময় রাখুন। কারণ জীবনের কঠিন মুহূর্তে একজন সত্যিকারের বন্ধু অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে, এসকোয়ার ইন্ডিয়া
এসএকেওয়াই








