লেবু জাতীয় ফল সাতকরা। আলাদা সুগন্ধ ও স্বাদের কারণে ভোজন রসিকদের কাছে এটি খুবই প্রিয়। গরু বা খাসির মাংস রান্নায় সাতকরার কোনো তুলনা চলে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যারাই সিলেটে আসেন, তাদের খাবারের তালিকায় পছন্দের শীর্ষে থাকে সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস ভুনা।

সাতকরাকে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ফল বলা হলেও এটি মূলত সারা বছরই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। আবার সিলেট থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। যে কারণে এটিকে সিলেটের সাতকরা বলা হয়ে থাকে।

সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি বিভাগের অর্ধশতাধিক ফলের তালিকায় সাতকরার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগের চার জেলার মধ্যে শুধুমাত্র সিলেট জেলায় মাত্র ১ হেক্টর জমিতে সাতকরার আবাদ হয়েছে। আর ফলন হয়েছে মাত্র ১ মেট্রিক টন।

অবশ্য একসময় সিলেট অঞ্চলে সাতকরা দেখা গেলেও এখন সেই চিত্র প্রায় বিলীন। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ‘সাতকরাকান্দি’ গ্রামও একসময় সাতকরার জন্য পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন সেখানে হাতেগোনা কয়েকটি গাছ ছাড়া আর তেমন উৎপাদন নেই।

ভারত থেকে আমদানি করে রপ্তানি হয় ‘সিলেটের সাতকরা’ নামে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই ও চাষাবাদে অনাগ্রহের কারণে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে সাতকরা উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশে সাতকরার বাজার এখন ভারত থেকে আমদানিনির্ভর।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি হওয়া সাতকরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হয়।

আরও পড়ুন

বিএসটিআইয়ের উপ-পরিচালক / উচ্চ বিমান ভাড়ার কারণে ফল রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর সাতকরা ব্যবসায় লোকসানের কারণে এবার ভারত থেকে আমদানিও কম হয়েছে। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা ও কদমতলী এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে সাতকরার সরবরাহ খুবই কম। যে কয়েকটি দোকানে সাতকরা পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আকারে এখনও ছোট ও পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। মানভেদে প্রতিপিস সাতকরা ৪০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু দোকানে আরও বেশি দামও চাওয়া হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে ভারতীয় সীমান্তবর্তী আসাম ও মেঘালয় থেকে প্রচুর সাতকরা আসে। কিন্তু এবার আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সংকট রয়েছে।

বন্দরবাজারের সাতকরা বিক্রেতা মোসাইদ আলী বলেন, ‘ঈদের সময় সাতকরার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রবাসীরা দেশে এলে বেশি কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এবার বাজারে সাতকরা কম।’

ভারত থেকে আমদানি করে রপ্তানি হয় ‘সিলেটের সাতকরা’ নামে

নগরীর কদমতলী ফল বাজারের সাতকরার পাইকারি বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, সিলেটে সাতকরার ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমদানিকারকরা বর্তমানে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ভারত থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বস্তা সাতকরা আমদানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিকেজি সাতকরায় সরকারকে কর দিতে হয় ৭৬ টাকা। অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বর্তমান বিক্রয়মূল্যে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসান হওয়া সত্ত্বেও কেবল সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখার খাতিরে ব্যবসায়ীরা এই পণ্যটি আমদানি অব্যাহত রেখেছেন।

আরও পড়ুন

তরমুজের খোসায় নতুন সম্ভাবনা, খাদ্য থেকে হতে পারে আয়ের উৎস

সাতকরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. নাজমুল আলম লিজন বলেন, সাতকরা সিলেটের এখন আর নেই বললেই চলে। ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয় লাজ্যের উঁচু পাহাড়ে সাতকড়া জন্মায়। আমরা ভারত থেকেই সাতকরা আমদানি করে থাকি।

তিনি বলেন, এখন সতকরা আমদানি কমে গেছে। একসময় সিলেটের ৪-৫ জন ব্যবসায়ী সাতকরা আমদানি করতেন। লোকসান গুণতে গুণতে এখন এক-দুইজন ছাড়া সবাই এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

সিলেটের খাদিমনগর এলাকার হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, সিলেটে যে সাতকরা পাওয়া যায়, তা মূলত সিলেটের নিজস্ব পণ্য নয়। এটি ভারত থেকে আমদানি করা হয়। জকিগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় প্রচুর সাতকরার বাগান থাকলেও আমাদের সিলেটে এ ধরনের কোনো বাগান দেখা যায় না। সাতকরাকে সিলেটের নিজস্ব ব্র্যান্ড বা পণ্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

খুলনার ফল খাতে সম্ভাবনার চেয়ে সংকটই বেশি

তিনি বলেন, সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত সাইট্রাস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এটি নিয়ে গবেষণা করছে, তবে সিলেটে এর উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত।

তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সাতকরা গাছ লাগিয়েছি। কিন্তু সেগুলোর বৃদ্ধি খুবই ধীর। দীর্ঘ সময় পার হলেও তাতে এখনো ফল ধরেনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন খান বলেন, একসময় সাতকরা সিলেটের গর্ব ছিল। কিন্তু এখন বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে বাজারের চাহিদা ভারতীয় সাতকরার ওপর নির্ভরশীল। এসব সাতকরার একটি অংশ আবার ‘সিলেটি সাতকরা’ নামে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

এফএ/জেআইএম