ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) গগনযান’সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিতে কর্মরত বিজ্ঞানীদের ইস্তফা ও স্বেচ্ছা অবসরের হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে দেশটির মহাকাশ বিভাগ (ডিওএস)। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এই গণইস্তফা ঠেকাতে এবং জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইস্তফা ও স্বেচ্ছা অবসরের নিয়মে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

গত ১৪ জুলাই মহাকাশ বিভাগের জারি করা এক অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপির (মেমোরেন্ডাম) মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়।

যদিও মহাকাশ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি, তবে ইসরোর একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সংখ্যাটি বেশ উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী সংস্থাটি ছেড়েছেন। এতে ইসরোর প্রকল্পগুলোর গতি ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ভারতের সবচেয়ে বড় রকেট উড্ডয়ন কেন্দ্র ‘বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার’ (ভিএসএসসি) থেকে অন্তত ২০ জন এবং ‘ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার’ (ইউআরএসসি) থেকে প্রায় ৮০ জন বিজ্ঞানী পদত্যাগ করেছেন।

পদত্যাগকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত দক্ষ ও প্রথম সারির বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভিএসএসসি-এর এলভিএম-৩ রকেট প্রকল্পের পরিচালক ভিক্টর জোসেফ এবং ইউআরএসসি-এর স্প্যাডেক্স (SpaDeX) প্রকল্পের পরিচালক।

এ ছাড়া চন্দ্রযান-৩ মিশনের সিমুলেশন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আদিত্য রাল্লাপাল্লিও সম্প্রতি ইসরো ছেড়েছেন। আদিত্য চন্দ্রযান-৩-এর চাঁদে অবতরণের স্পর্শকাতর ধাপগুলো যাচাই করতে ১ লাখের বেশি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ২৫ টেরাবাইট ডেটা বিশ্লেষণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মিশনটির সফলতায় তাঁর এই কর্মযজ্ঞ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মহাকাশ বিভাগের অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি গগনযান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মিশনের সঙ্গে যুক্ত গ্রুপ “এ” বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি কর্মকর্তাদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

নতুন জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, গগনযান বা অন্যান্য প্রধান মিশনের বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন এখন থেকে আর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বা সহজেই গ্রহণ করা যাবে না। প্রকল্পগুলো পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোর পরিচালকদের এই আবেদনগুলো অনুমোদন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এর পরিবর্তে, সমস্ত আবেদন সরাসরি মহাকাশ বিভাগে (ডিওএস) পাঠাতে হবে এবং পরিচালকের সুপারিশ সাপেক্ষে বিভাগ নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

এই নির্দেশের মাধ্যমে ২০২০ সালের নভেম্বরে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো। ২০২০ সালের নিয়ম অনুযায়ী, ইসরোর কেন্দ্র পরিচালক ও ইউনিট প্রধানদের গ্রুপ “এ” বিজ্ঞানীদের ইস্তফা ও স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন সরাসরি মঞ্জুর করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা এখন প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো।

বিজ্ঞানীদের এই চলে যাওয়াকে অবশ্য বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখতে নারাজ ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন। সংবাদমাধ্যমের কাছে বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেকেই চলে যাচ্ছেন, তবে এটি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই স্বাভাবিক বিষয়। এই নতুন নির্দেশিকার মূল উদ্দেশ্য কেবল বিজ্ঞানীদের আটকে রাখা নয়, বরং হুট করে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থমকে না যায় তা নিশ্চিত করা। যদি কেউ চলেও যান, অন্য কেউ সেই দায়িত্ব বুঝে নেবেন। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।’

অবশ্য গত দুই দশকে ইসরো থেকে বিজ্ঞানীদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন কর্মী ইসরো ছেড়েছেন। এমনকি ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে সংস্থাটিতে যোগ দেওয়া নতুন কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই ইস্তফা দিয়েছিলেন।

বর্তমানে ইসরোর মোট কর্মীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৬০০-এর বেশি। নতুন করে ১ হাজার ৫০টি বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক পদে নিয়োগের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের শূন্যস্থান নতুন রিক্রুট দিয়ে হুট করে পূরণ করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে গগনযানের মতো জটিল মহাকাশ মিশনের ক্ষেত্রে।