বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনার অভাব নেই। তবে বাস্তবায়নের দুর্বলতা, অর্থায়নের সংকট ও সমন্বিত ব্যবস্থার অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। নতুন নীতির চেয়ে বিদ্যমান নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, কর্মপরিকল্পনা ও বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) দ্রুত চালু করতে হবে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে ব্র্যাকের বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান সমন্বয়কারী সংকলিতা সোম এ কথা বলেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।

সংকলিতা সোম বলেন, বাংলাদেশ ২০০২ সালেই পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার দুই দশক পরও বাজার, জনসমাগমস্থল, নদী ও খালে নির্বিঘ্নে পলিথিনের ব্যবহার দেখা যায়। এতে স্পষ্ট, নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনাগোলটেবিল আলোচনায় আলোচকরা/ছবি: জাগো নিউজ

দেশে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস ও প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান রয়েছে জানিয়ে বলেন, এখন প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর, অর্থায়ন-নির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা, যা মাঠপর্যায়ে এসব নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

তার ভাষ্য, প্লাস্টিক শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ বাড়ছে ও মানুষের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো চেইনকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে।

আরও পড়ুন

প্লাস্টিক পুনঃব্যবহারে ভ্যাট-ট্যাক্স নয়, প্রয়োজন প্রণোদনা

তিনি বলেন, শুধু জনসচেতনতা বা বর্জ্য পৃথকীকরণ করলেই হবে না। সংগ্রহ, পরিবহন, পুনরুদ্ধার (রিকভারি), পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) ও পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের বাজার- সব ধাপকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। কোনো একটি ধাপে দুর্বলতা থাকলে পুরো প্রক্রিয়াই ব্যাহত হবে।

সংকলিতা সোম জানান, বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে ব্র্যাক ও প্রাণ-আরএফএল সাভার পৌরসভার সঙ্গে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালনা করছে। সেখানে মিশ্র বর্জ্য থেকে বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করা হলেও ব্যবহৃত ডায়াপার, জুতা, চামড়াজাত পণ্য এবং মাল্টি-লেয়ার প্লাস্টিক (এমএলপি) পুনর্ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সেগুলো শেষ পর্যন্ত ল্যান্ডফিলে ফেলতে হচ্ছে।

বর্তমানে প্রায় এক টন এমএলপি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু রিসাইক্লিং সুবিধা না থাকায় এর কোনো কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধানে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়নের জন্য বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) বাস্তবায়ন জরুরি।

সংকলিতা সোম বলেন, বাংলাদেশে পাইলট প্রকল্পের অভাব নেই। এখন প্রয়োজন সফল উদ্যোগগুলোকে পূর্ণাঙ্গ পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেলে রূপ দেওয়া এবং স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী তা সম্প্রসারণ করা। কারণ, এক এলাকার মডেল অন্য এলাকায় একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।

প্লাস্টিক পুনঃব্যবহারে ভ্যাট-ট্যাক্স নয়, প্রয়োজন প্রণোদনাব্র্যাকের বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান সমন্বয়কারী সংকলিতা সোম/ছবি: জাগো নিউজ

বাংলাদেশ সাসটেইনেবিলিটি অ্যালায়েন্স সেন্ট মার্টিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে বলে জানান তিনি। বলেন, এছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি জিরো ওয়েস্ট ক্যাম্পাস মডেল ও এ সংক্রান্ত টুলকিট তৈরি করা হয়েছে, যা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রয়োগ করা সম্ভব।

বৈঠকে তিনি তিনটি সুপারিশ তুলে ধরেন। প্রথমত, ইপিআর বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ প্রণয়ন, যেখানে ধাপে ধাপে লক্ষ্য, অর্থায়ন ব্যবস্থা, যাচাই প্রক্রিয়া ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ থাকবে। দ্বিতীয়ত, সংগ্রহ থেকে রিসাইক্লিং ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে অন্তর্ভুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, কম মূল্যমানের নমনীয় প্লাস্টিক ও মাল্টি-লেয়ার প্লাস্টিকের জন্য আলাদা সংগ্রহ, অর্থায়ন ও রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

আরও পড়ুন

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিককে সম্পদে রূপ দিচ্ছে প্রাণ-আরএফএল

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার হলেও তা মূলত উচ্চমূল্যের প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। বিপুল পরিমাণ নিম্নমূল্যের নমনীয় প্লাস্টিক এখনো সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাই পণ্যের নকশা পর্যায় থেকেই রিসাইক্লিং উপযোগী প্লাস্টিক ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সংকলিতা সোম আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতি নতুন নীতিতে নয়, বরং উৎপাদন, পৌর বর্জ্য সংগ্রহ, পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারকে সংযুক্ত করে অর্থায়নসমৃদ্ধ, জবাবদিহিমূলক ও সমন্বিত একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো-ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

এসএম/এএসএ