বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে ভর্তুকি কমাতে না পারা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার এই চার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির মতে, কিছু কিছু খাতে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও উল্টো বাড়িয়েছে নতুন বাজেটে। এর তীব্র সমালোচনা করে অসন্তোষ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে আগের সরকারের মতোই এ সরকারও ঢিলেঢালা ভাব দেখাচ্ছে। যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

১২ জুলাই থেকে ঢাকা সফরে আসা আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে। এসব বৈঠকেই প্রতিনিধি দলটি এসব উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এ সময় বলা হয়, সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও কাঠামোগত সংস্কারে ধীরগতি ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নতুন ঋণ কর্মসূচি ও চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আইএমএফের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। আইএমএফের মূল্যায়নে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। ডলারের বাজারেও অস্থিরতা কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় প্রবাহেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে অর্থনীতি সংকটময় অবস্থা থেকে বেরিয়ে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখনো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থান, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সুশাসন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি। এ ছাড়া ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টে নতুন ধারা সংযোজন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। যদিও সে সিদ্ধান্ত থেকে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছে সরকার। সংস্থাটির মতে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও বাজারভিত্তিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিধান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে নীতিগত দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা আরও জোরদার করতে হবে বলে মত দিয়েছে তারা।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইস্যু হলো : নতুন পে-স্কেল। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আলোচনা চললেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি কার্যকর করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম এবং বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এ অবস্থায় বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। আইএমএফের মতে, মূল্যস্ফীতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল চালু হলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হবে, যা ভোগব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল আলোচিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তৃতীয় উদ্বেগের জায়গা রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহ এই দুটি পৃথক কাঠামোয় পুনর্গঠনের সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি ধীর হওয়ায় সংস্থাটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো না গেলে সরকারের আয় বৃদ্ধি কঠিন হবে। আইএমএফের পর্যবেক্ষণে, রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিক ঘাটতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করছে। তাই রাজস্ব সংগ্রহের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটি আরও মনে করে, আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রমে জাতীয় সংসদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। সংস্কার উদ্যোগগুলোকে টেকসই করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছে আইএমএফ। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের পর্যবেক্ষণ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে উন্নতি হলেও ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বজায় রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

The post ভর্তুকি পে-স্কেলসহ চার ইস্যুতে বড় উদ্বেগ আইএমএফের appeared first on ZoomBangla.