সাইনবোর্ড নেই, নেই নিয়মিত পাঠদান। তবুও কাগজে-কলমে থাকা মাগুরার শালিখা উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দেড় কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ পেয়েছে।

মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের এই বরাদ্দকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যে প্রতিষ্ঠানের নেই সরকারি স্বীকৃতি, নেই সাইনবোর্ড, নেই দৃশ্যমান শিক্ষা কার্যক্রম, সেই প্রতিষ্ঠানের নামেই ভবন নির্মাণের জন্য দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর ডিও লেটারের ভিত্তিতে।

আরও পড়ুন

৫১ লাখ টাকা জালিয়াতি: উপজেলা পরিষদের সেই ৩ কর্মচারী বরখাস্ত

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে। সেখানে নেই নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম, নেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, এমনকি কোনো সাইনবোর্ডও নেই। চাতালের পাশে জরাজীর্ণ দুটি টিনশেড ঘর আর উপজেলা পরিষদ থেকে দেওয়া কয়েকটি বেঞ্চই যেন প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র দৃশ্যমান অস্তিত্ব।

জানা গেছে, গত অর্থবছরের শেষ দিকে ২১ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর মাগুরার দুই সংসদীয় আসনের ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেড় কোটি টাকা করে মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এরই অংশ হিসেবে শালিখার মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের অনুকূলে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের নকশা অনুমোদনের লক্ষ্যে মাটি পরীক্ষার কাজও শুরু করেছে মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ।

তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শালিখা উপজেলায় এ নামে কোনো এমপিওভুক্ত বা স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। যদিও আড়পাড়া ইউনিয়নের চুকিনগর গ্রামে একই নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন

চেম্বারে রোগী দেখেন রামেক হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান মুন্সী শহিদুর রহমানের নামে তার ছেলে মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব ২০১৮ সালের দিকে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ওপর দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে কলেজ চালুর উদ্যোগ নেন। শুরুতে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও একাডেমিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে নেই কোনো শিক্ষা কার্যক্রমের দৃশ্যমান চিহ্ন। চারপাশ আগাছায় ভরা, ঘরগুলো জরাজীর্ণ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ার চিত্রই চোখে পড়ে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পরিচয়দানকারী মুন্সী কামরুজ্জামান নবাবের বিরুদ্ধে ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে জনপ্রতি দুই থেকে তিন লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত বেতন-ভাতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কেউই কোনো বেতন পাননি। ২০২০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে নিয়োগপ্রাপ্তরা টাকা ফেরত চাইলে তা আর ফেরত পাননি।

ভূতুড়ে কলেজে দেড় কোটি টাকার বরাদ্দ

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব। তিনি বলেন, সরকারি অনুমোদন না থাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছিল, টাকার বিনিময়ে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

তার দাবি, বর্তমানে কলেজে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, দুটি শিফটে পাঠদান চলছে এবং চলতি বছর ৭০ জন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

আরও পড়ুন

মাছির ‘পেটে’ ১০০ কোটি টাকার ফজলি আম

তবে শালিখা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে মোবারক বলেন, চলতি বছরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির মোট ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। বাস্তবে পাঠদান কার্যক্রম না থাকলেও কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চলমান দেখানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেছে। আমাদের ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জরিপ প্রতিবেদন এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষাসহ নকশা অনুমোদনের কাগজপত্র পাঠাতে বলা হয়েছে। জরিপে যে তথ্য পাওয়া যাবে, সেটিই অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানিয়েছে। বরাদ্দের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না, কারণ এটি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে।

মিনারুল ইসলাম জুয়েল/এফএ/এএসএম