নাজিফা রাসেল স্বপ্না

আমার নাম নেই। মানুষ আমাকে ডাকে—কালো ছায়া। আজ আমি নিজের জবানবন্দি দিতে এসেছি। কারণ যে অপরাধের দায়ে আমাকে এত বছর ধরে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তার সবটাই সত্য নয়।

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালের এক বর্ষার রাতে। সেই রাতে গ্রামের শেষ মাথার পুরোনো জমিদারবাড়িটায় বজ্রপাত হয়েছিল। মানুষ বলতো, বাড়িটা অভিশপ্ত। দিনের বেলায়ও কেউ ওদিক দিয়ে হাঁটতো না। কিন্তু একজন গিয়েছিল। তার নাম ছিল আরিফ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতো না। গ্রামের মানুষের ভয়কে সে কুসংস্কার বলে হাসতো।

রাত দশটার দিকে হাতে টর্চ নিয়ে সে ঢুকে পড়লো জমিদারবাড়িতে। আমি তখনো ওখানে ছিলাম। অন্ধকার বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলাম। আরিফের টর্চের আলো ভাঙা দেওয়াল, ছেঁড়া পর্দা আর ধুলোমাখা ছবিগুলোর ওপর ঘুরছিল। হঠাৎ সে শুনলো কারো ফিসফিসানি, ‌‘ফিরে যাও...’
সে হেসে বললো, ‘কে? বেরিয়ে আসো!’
কেউ বেরিয়ে এলো না। বরং ওপরের তলা থেকে ধীরে ধীরে কারো হাঁটার শব্দ ভেসে এলো। আরিফ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো। তার সাহস দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। কারণ সে জানতো না, ওপরে কী অপেক্ষা করছে।

দোতলার শেষ ঘরটার দরজা আধখোলা ছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল একটা পুরোনো আয়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন মানুষ। পিঠ ফিরে। নিঃশব্দ। আরিফ ডাকলো, ‘এই!’
লোকটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তখনই আরিফের হাত থেকে টর্চ পড়ে গেল। কারণ লোকটার কোনো মুখ ছিল না। চোখ নেই। নাক নেই। মুখ নেই। শুধু মসৃণ, ফ্যাকাশে চামড়া।

আতঙ্কে আরিফ পিছিয়ে যেতে লাগলো। ঠিক তখনই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। হ্যাঁ, আমি। কালো ছায়া। কিন্তু তাকে মারার জন্য নয়। বাঁচানোর জন্য। কারণ যে মুখহীন জিনিসটা তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা মানুষ ছিল না। ওটা ছিল অপেক্ষা। একটা অদ্ভুত সত্তা, যে ভয় খেয়ে বেঁচে থাকে।
আরিফ যদি আরও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতো। তবে তার মানসিক ভারসাম্য চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেত। আমি তাকে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামালাম। সে অজ্ঞান হয়ে গেল।

ভোরে গ্রামের লোকেরা তাকে বাড়ির বাইরে পড়ে থাকতে দেখেছিল। তারপর থেকে সবাই বললো—‘কালো ছায়া আরিফকে আক্রমণ করেছে।’
কেউ সত্যটা জানলো না। কেউ জানলো না যে, আমি সেই বাড়ির অভিশাপ নই। আমি তার প্রহরী। কারণ বহু বছর আগে আমিও মানুষ ছিলাম। আমি ছিলাম সেই জমিদারবাড়ির শেষ বাসিন্দা। আর সেই মুখহীন সত্তার হাতেই আমার মৃত্যু হয়েছিল। মরার পর আমি যেতে পারিনি। বেঁচে থাকা মানুষদের সতর্ক করাই আমার কাজ হয়ে গেল। কিন্তু মানুষ যা বোঝে না, তাকে ভয় পায়। আর যাকে ভয় পায়, তাকে দানব বানিয়ে দেয়।

তাই আজ এই জবানবন্দি। আমি কালো ছায়া। আমি কাউকে হত্যা করিনি। আমি শুধু পাহারা দিই। তবু আজও গভীর রাতে, জমিদারবাড়ির সামনে কেউ গেলে, অন্ধকার থেকে একটা ফিসফিসানি ভেসে আসে—‘ফিরে যাও...’। আর যারা সেই সতর্কবাণী উপেক্ষা করে, তারা আর কখনো আগের মতো ফিরে আসে না।

আরও পড়ুন

ভৌতিক গল্প: আষাঢ়ের রাত

এসইউ