কলকাতার বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের পাশে অবস্থিত শতাব্দী প্রাচীন গৌরীপুর মসজিদটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। মসজিদ কমিটি , এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্মতির ভিত্তিতে একটি বিশেষ পরিদর্শক দল ও নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে শনিবার থেকেই শতাব্দী প্রাচীন মসজিদটিতে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। 

১৩৬ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদ যা অনেকের কাছে যা ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থান বর্তমানে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের  নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হয়। 

কলকাতার দ্বিতীয় রানওয়ের একেবারে গা ঘেঁষে থাকায় প্রবল বর্ষণ বা ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার সময় পাইলটের পক্ষে রানওয়ে থেকে সামান্য দূরত্বে এই মসজিদ ভিজ্যুয়াল ইলিউশন তৈরি করে। এতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, বাঁকড়া মসজিদটি বিমানবন্দরের সেকেন্ডারি বা সহকারী রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরত্বে অবস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি স্পষ্ট বলছে, রানওয়ে থেকে যেকোনো কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে বেশ কিছুটা কম দূরত্বে রয়েছে মসজিদটি। রানওয়ের এত কাছাকাছি এই কাঠামোটি থাকার কারণে সেখানে আধুনিক ‘ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’  বসানো যাচ্ছিল না।  এর ফলে বিমানবন্দরের উড়ান পরিচালনার সামগ্রিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

বর্তমান এই কাঠামোগত বিন্যাসের কারণে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। মসজিদটির অবস্থানের দরুন সেকেন্ডারি রানওয়ের ‘টাচডাউন পয়েন্ট’ বা বিমান ছোঁয়ার নির্দিষ্ট স্থানটিকে বাধ্য হয়ে কিছুটা এগিয়ে এনে ছোট করতে হয়েছিল। আর রানওয়ের এই সীমাবদ্ধতার কারণে বড় চেহারার আন্তর্জাতিক বিমানগুলো এই রানওয়েটি ব্যবহার করতে পারছিল না। মসজিদটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গেলে এই সমস্ত বাধা-বিপত্তি এক ঝটকায় দূর হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে পরিকাঠামোগত আধুনিকীকরণের রাস্তা সাফ হওয়ায় বিমান চলাচল ব্যবস্থাও অনেক উন্নত হবে।

কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছিল, হজ মৌসুম শেষ হওয়ার পরেই ২০১৩ সালের আগে কলকাতা বিমানবন্দর যে পুরনো টার্মিনাল ভবনটি ব্যবহার করত, সেটিও এবার ভেঙে ফেলা হবে। পুরনো টার্মিনাল ভবনটি ভেঙে ফেলার পর নতুন টার্মিনাল তৈরি এবং মসজিদ স্থানান্তরের পর দ্বিতীয় রানে পুরোদমে চালু করা গেলে কলকাতা বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন করার ক্ষমতা এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি। ফলে আগামী দিনে কলকাতার মাটি থেকে আন্তর্জাতিক স্তরের বিমান পরিষেবা যে আরও অনেক মসৃণ ও প্রসারিত হবে। 

এই মসজিদের কারণে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজও থমকে আছে প্রায় ৩০ বছর। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি বারেবারে আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু কখনও স্থানীয় বাধা, কখনও পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারের ঢিলেমিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়নি। তার বদলে প্রাধান্য পেয়েছে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট নিয়ে রাজনীতি। 

তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। ফের মসজিদ সরানো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ঈদের নমাজ ওই মসজিদে পড়েন বহু মানুষ। তাদের ভাবাবেগকেও প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল রাজ্য সরকার এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ঠিক হয়েছিল, ঈদ শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মনে করা হচ্ছে আজ শনিবার থেকেই এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে স্থানীয় স্তরে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় গোটা বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা এলাকা। 

মসজিদ কমিটির তরফে আগেই এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “আমরা চাই না আমাদের কারণে বিমানবন্দরের কোনো ক্ষতি হোক বা সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটুক। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের বিমানবন্দরের বাইরে আরো বড় একটি মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় আমরা এই মুহূর্তে নেই।”

স্থানীয় বিধায়ক সৌরভ শিকদার বলেন, "যারা নামাজ পড়তে যান তাদের কোন পাশ ইস্যু করা হয় না। শুধুমাত্র আধার কার্ড জমা রেখে তাদের রানওযের পাশে থাকা ওই মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনারা জানেন আগের সরকারের আমলে কত জাল আধার কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। নিরাপত্তার একটা সংকট তৈরি হয়। একইসঙ্গে যারা নামাজ পড়তে যান তাদের জন্য  সিআইএসএফ জওয়ান মোতায়েন রাখতে হয়। একটা বাস সবসময় যাতায়াতের জন্য রাখতে হয়। মসজিদটির জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। এজন্য বড় বিমান আসতে পারে না। বিমানবন্দরের রিভিনিউ লস হচ্ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এক কথায় বিমানবন্দরের উন্নয়ন কিছুই হচ্ছে না। আবার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। আমরা মসজিদ কমিটিকে বলেছি রানওয়ের বাইরে এয়ারপোর্ট অথরিটির অন্য জমি আপনারা চিহ্নিত করুন আমরা দিয়ে দেব।” 

১৯২৪ সালে চালু হয় কলকাতা বিমানবন্দর। জমিটি প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তি। পরে ১৯৬২ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। তখন মসজিদের পাশেই ছিল যশোর রোড। বিমানবন্দরের জন্য যশোর রোড ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। মসজিদটি থেকে যায় বিমানবন্দরের পাঁচিলের ভিতর, রানওয়ের পাশেই। এবার সেটি সরাতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। 

১৯৬২ সালের জমি অধিগ্রহণের অন্যতম শর্ত হিসেবে গৌরীপুর কালীমন্দিরের (যশোর রোডের ওপর) বিপরীতে একটি ছোট্ট লোহার গেট করা আছে। তার ওপর রয়েছে সিআইএসএফ ওয়াচ টাওয়ার। গেটের কলিং বেল বাজালে নমাজ পাঠ করতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য গেট খোলা হয়। তাদের আধার কার্ড যাচাইয়ের পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ বাসে করে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যান। (এই বাসগুলি টার্মিনাস থেকে যাত্রীদের টারম্যাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত বাসের কয়েকটি)। দৈনিক তিনটি শিফটে এরকম ৪ টি করে বাসের ব্যবস্থা করা থাকে। এই বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে ওই মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া কার্যত অসম্ভব। 

শনিবার যদি মসজিদটি ভাঙার কাজ শুরু হয় বাইরের জগতের মানুষ সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না। কারণ ভাঙার যন্ত্রপাতি বিমানবন্দরের নিজস্ব। সেগুলি পুরাতন টার্মিনাস কার্গো বিভাগ থেকে সরাসরি রানওয়ে হয়ে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াত করবে।