ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর খাবার, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবার খোঁজে হাজার হাজার মানুষ মরিয়া হয়ে ঘুরছেন। এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে হতাশার মধ্যেও একটুখানি আশার খবর এসেছে। ভূমিকম্পের ছয় দিন পর রাজধানী কারাকাসে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পকে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে আবাসিক ভবন ও পুরো কমপ্লেক্স ধসে পড়ে। কয়েক দশ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন এবং আটকে পড়াদের উদ্ধারে শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান।

ভূমিকম্পের প্রায় এক সপ্তাহ পর জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স দলের সদস্যরা কারাকাসে একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটিকে খুঁজে পাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল।

সাধারণত জীবিত মানুষ উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয় প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে। সেই সময়সীমা গত শনিবার সন্ধ্যায় শেষ হয়ে গেলেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বন্দরনগরী লা গুয়ারিয়ায় খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। মৌলিক সেবাগুলো ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন।

লা গুয়ারিয়ার ১৮ বছর বয়সী বিক্রেতা দানিয়েলা আরমাস বলেন, ‘ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কখনও কখনও খাবারের জন্য মানুষ প্রায় একে অপরকে মেরে ফেলার অবস্থায় চলে যাচ্ছে। এটা যেন মোরগ লড়াইয়ের মতো।’ ভূমিকম্পের সময় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে তিনি আহত হন।

দৈনিক হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জনে। আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৫০০ জনের বেশি। তাঁর ভাষ্য, শুধু লা গুয়ারিয়ার ধ্বংসস্তূপ থেকেই প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিজেরা বের হয়ে আসা বা পরিবারের সহায়তায় বের হতে পারা মানুষদের হিসাব ধরলে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার হতে পারে।

সরকারের ধীর প্রতিক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। বহু বছর ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে মনে করছেন অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী। জাতিসংঘ জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসে ৩০ হাজার মানুষের জন্য সহায়তা ও অস্থায়ী আশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার প্রয়োজন হবে।

নাসার প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ বলছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভূমিকম্পের আগেই টিকাদানের হার কম ছিল। ফলে হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেও অনেক মানুষ নিজেরাই ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজছেন। কেউ হাসপাতাল, কেউ মর্গে ছুটছেন। নিজের বোন সোরাইদাকে খুঁজতে গিয়ে রোসানা লুনা বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন হলো না জানা। তখন শুধু মনে হয়, আমি কী করব? কোথায় খুঁজব?’

এএফপির সাংবাদিকরা সোমবার লা গুয়ারিয়ার অস্থায়ী মর্গের পাশে কালো বডিব্যাগের সারি দেখতে পান। সেখানে বহু মানুষ অপেক্ষা করছিলেন স্বজনদের শনাক্ত করার জন্য। ৩৭ বছর বয়সী দারভিন সিলভা জানান, ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মায়ের কাছে পৌঁছাতে তিনি খালি হাতে, বড় হাতুড়ি ও গাঁইতি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁকে বের করে আনতে আমি যা করেছি, সেটা কল্পনাও করা কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘এখন শুধু চাই, তাঁকে যেন প্রাপ্য শান্তিটুকু দিতে পারি।’

জাতিসংঘের হিসাবে এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ।

জাতিসংঘ বলছে, এ দুর্যোগে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভূমিকম্পে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। মোট ২৭টি দেশ প্রায় ৪০টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। এসব দলে রয়েছেন ২ হাজারের বেশি সদস্য এবং ১৬০ টির বেশি উদ্ধারকারী কুকুর।

জাতিসংঘ ১০ হাজার বডিব্যাগ সরবরাহ করছে। যদিও সংস্থাটি আশা করছে, শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা আশঙ্কার চেয়ে কম হবে। কারাকাসের একমাত্র সরকারি কবরস্থানে দুটি দাহচুল্লি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। লা গুয়ারিয়ার অস্থায়ী মর্গে এখনও বহু মানুষ অপেক্ষা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা উইলকার মোল্লালা বলেন, ‘আমার বোন, তাঁর সন্তানরা, আমার ভাইয়ের সন্তানরা...সবাই সেখানে আছে বলে আমাকে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারে ১১ জন ছিল। আমরা শুধু দুজন বেঁচে আছি। কারণ আমরা তখন কাজে ছিলাম।’