ভেনিজুয়েলায় শতবর্ষের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রোববার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দেশটিতে ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা লা গুয়েইরা কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ভেনিজুয়েলার দুর্গত পরিবারগুলোর সদস্যদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, অন্তত ৬৮ হাজার ৯০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে লাতিন দেশটিতে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৪ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে কার্যত সেখানে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। শত শত মানুষ ধ্বংসস্তূপের পাশে স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করছেন। হাজারো মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তা, মাঠ কিংবা অন্য কোনো খোলা স্থানে রাত পার করছেন।
জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা প্রাণহানি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় নিযুক্ত জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা জিয়ানলুকা রামপোলা শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভূমিকম্পে চূড়ান্ত প্রাণহানির সংখ্যা ‘নিশ্চিতভাবেই বর্তমান সংখ্যার চেয়ে বেশি’। তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপে ঠিক কতজন আটকা পড়ে আছেন, তা আমরা আসলে জানি না।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংস্থাটি বলছে, কারাকাসে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বাস। এছাড়া লা গুয়াইরা রাজ্যের বন্দরনগরী কাতিয়া লা মারের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যদিও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজই এখন তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার, তবে এ দুর্যোগের মানবিক প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও থাকবে।
সরকারের পদক্ষেপকে অনেকেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। কারণ এ বিশাল বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সেনা, দমকলকর্মী, পুলিশ ও সামরিক ক্যাডেটদের প্রস্তুতি ছিল স্পষ্টতই অপ্রতুল। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ভেনিজুয়েলার কর্মকর্তারা জানান, শনিবার ১ হাজার ৬০০-এরও বেশি উদ্ধারকর্মী নিয়ে ১৭টি বিমান দেশটিতে পৌঁছেছে।
ইতোমধ্যে ভূমিকম্প আঘাত হানার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এতে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। প্রতিটি মুহূর্তই এখন দীর্ঘ ও স্বজনদের উদ্বেগে পূর্ণ। ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় শহর কারাবাল্লেয়াদায় উদ্ধারকাজে নিয়োজিতদের একজন মাইলেইডি রোমেরো। শনিবার তিনি বলেন, ‘গত রাতের (শুক্রবার) মৃতদেহগুলোর একটি স্তূপ ওখানে পড়ে আছে। এর মধ্যে নবজাতক শিশুরাও রয়েছে। (শুক্রবার) রাত ৮টার সময়ও সেখানে মানুষ জীবিত ছিল, অথচ তাদের উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। আমরা বেশ কয়েকটি মৃতদেহের অবস্থান শনাক্ত করেছি। কিন্তু সেগুলো উদ্ধারের ক্ষেত্রেও কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি।’
কেউ কেউ ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের ওপর উঠে স্বজনের নাম ধরে ডাকছেন, যদি প্রাণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়। উপকূলীয় জনপদগুলো ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছিল। তীব্র গরমের মধ্যে পচন ধরা লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি উৎপত্তি হওয়া একাধিক ভূমিকম্প দ্রুত পরপর আঘাত হানার ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। বেশ কয়েক দিন ধরেই রাজধানী কারাকাস এবং ভূমিকম্প-কবলিত এলাকাগুলোতে ছোটখাটো আফটারশক বা পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার ৪ দশমিক ৮ মাত্রার একটি পরাঘাত হয়।
এ দুর্যোগটি প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে জানুয়ারিতে তিনি দায়িত্ব নেন। ভেনিজুয়েলা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চরম অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রদ্রিগেজ যে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেন, তার বৈধতা অনেকেই স্বীকার করেন না।








