ব্রাজিল ভক্তরা খানিক নিরব। তাদের মুখটা একদম বন্ধ না হলেও তারা তেমন একটা হৈ চৈ করছেন না। করার কথাও না। কারন পরিসংখ্যান জানাচ্ছে শক্তি, সামর্থ আর অর্জন , কৃতিত্বে বহুদুর পিছিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপে নরওয়ের সাথে এখনো পেরে ওঠেনি ব্রাজিল।

গত কদিন দেখলাম ঘুরে ফিরে গনমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্রাজিলের সেই পরাজয়ের কথাই উঠছে। সবার মুখে ঐ একটি কথা, ব্রাজিল ওয়ার্ল্ডকাপে নরওয়ের সাথে পারেনি আগে। সেটা অবশ্য ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের মাটিতে ঘটনাবহুল ম্যাচটিতে ব্রাজিল হেরেছিল ১ - ২ গোলে। তবে এমন নয় যে , নরওয়ে ভয়ঙ্কর এক প্রতিপক্ষ, তাই হেরেছিল ব্রাজিল।

খেলায় হারজিত আছে। গোলের খেলা ফুটবলে কখনো বেশী ভাল খেলা দল , গোলের সুযোগ বেশী তৈরী করা দলও প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার খেসারত দিয়ে হেরে যায়। ২৮ বছর আগে ফ্রান্সের মার্শেই শহরের ভেলোড্রাম স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচটি ছিল আসলে অমন এক ম্যাচ।
সেবারের বিশ্বকাপে সামগ্রীক বিচারে নরওয়ের সঙ্গে ম্যাচটির কোনই গুরুত্ব ছিলনা।

বলার অপেক্ষা রাখেনা ঐ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে দেখা হয়েছিল ব্রাজিল আর নওরয়ের। প্রথম দুই ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ২ - ১ আর মরক্কোকে ৩ - ০ গোলে হারিয়েই গ্রুপ থেকে সুপার সিক্সটিন নিশ্চিত করে ফেলেছিল ব্রাজিলিয়ানরা। শেষ ম্যাচটি ছিল অর্থহীন। হার জিত যাই ঘটুক ব্রাজিলই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ড খেলতো। এইরকম হিসেব নিকেশ সামনে রেখে ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন মার্শেইয়ের ভেলোড্রোম স্টেডিয়ামে নরওয়ের সাথে খেলতে নেমে খানিক দুলকি চালে খেলে ১ - ২ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। এবং পরবর্তীতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই সেরা ষোলোতে চিলির বিপক্ষে নক আউট পর্বে মাঠে নামে।

যেহেতু আগেই সুপার সিক্সটিন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল , তাই ব্রাজিলিয়ানরা জয়ের ব্যাপারে তত মরিয়া ছিলনা। ডুঙ্গা , লিওনার্দো, রিভালদো , বেবেতো , রোনাল্ডো আর ডেনিলসনরা খানিক রয়ে সয়ে খেলেছেন। নীচ থেকে রাইট উইং ব্যাক কাফু আর লেফট উইং ব্যাক রবার্তো কার্লোসও সহজাত ও ছন্দে ওপরে উঠে তেড়ে ফুড়ে আক্রমন শানানোর কাজেও অন্য দিনের মত মনোযোগি ছিলেন না। যে কারনে উইং ও মাঝ মাঠ দু দুকি দিয়েই ব্রাজিলের আক্রমন তেমন দানা বেঁধে ওঠেনি। তারপরও আক্রমন - পাল্টা আক্রমনে গোলশুন্য থাকে প্রথমার্ধের খেলা।

৭৪ মিনিটে বেবেতোর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। নরওয়ের বক্সের ঠিক বাইরে বাঁদিক ঘেষে বল নিয়ে বায়ে সেন্টার করেন ১৯ নম্বর জার্সিধারী ব্রাজিলিয়ান লেফট উইংগার ডেনিলসন। বিপরিত দিক থেকে ধেয়ে আসা বেবেতো ছোট বক্সের মধ্যে সামনে শরীর ফেলে হেডে জালে বল জড়িয়ে দেন। কিন্তু মাত্র ৯ মিনিট পর গোল শোধ করে দেন নরওয়ের স্ট্রাইকার তোরে আন্দে ফ্লো। বাঁদিক ঘেষে বল পেয়ে মার্কার ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জুনিয়র বাইয়ানোকে পিছনে ফেলে ডান পায়ের শটে ব্রাজিল গোলকিপার তাফারেলকে পরাস্ত করে খেলায় সমতা ফেরান নরওয়ের স্ট্রাইকার আন্দে ফ্লো।

শেষ বাশি বাজার এক মিনিট আগে ৮৯ মিনিটে কেটিল রেকদালের পেনাল্টি গোলে জয় পায় নরওয়ে। সেই পেনাল্টি নিয়ে ছিল নানা বিতর্ক। অনেকেই সেটাকে লঘু পাপে গুরুদন্ড বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন আমেরিকান রেফারি এসফান্ডিয়ার বাহারমাস্ত পেনাল্টির সিদ্ধান্ত না দিলেও পারতেন।

ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড রোনাল্ডো নরওয়ের সীমানায় বল হারালে তা একধীক নরওয়ের খেলোয়াড়ের পা ঘুরে চলে আসে বদলি খেলোয়াড এরিক মাইকল্যান্ডের পায়ে। বাঁদিক দিয়ে ব্রাজিলের সীমানার মাঝামাঝি থেকে এরিক তা ব্রাজিল বক্সে ফেলেন এরিক। নরওয়ের কোন খেলোয়াড় বলের নিয়ন্ত্রন নেয়ার আগে ব্রাজিলিয়ান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডোর ৪ নম্বর জার্সিধারি জুনিয়র বাইয়ানো বল বুক দিয়ে নামানোর চেষ্টা করেন। বল তার বুকের ওপরের অংশেই লাগে বেশী। নামানোর সময় বাহুতে ছুয়ে যায় খানিকটা। মোদ্দা কথা , নরওয়ের উইংগার এরিক মাইকল্যান্ডের সে ক্রস জুনিয়র বাইয়ানোর তে সেভাবে না লাগলেও যুক্তরাষ্ট্রর রেফারি বাহারমাস্ত ছুটে এসে পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দেন। পেনাল্টি থেকে নরওয়ের কেটিল রেকাদাল গোল করে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেন।

কাকতালীয়ভাবে এবার সেরা ষোলতে যে ব্রাজিল ও নরওয়ে ম্যাচ হবে , তাতেও রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন আমেরিকান রেফারি ইসমাইল ইলফাত। সেবার গ্রুপ পর্বে গুরুত্বহীন ম্যাচ বলেই হয়ত আমেরিকান রেফারি বাহারমাস্তের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রাজিলিয়ানরা তেমন হৈ চৈ করেননি। কিন্তু এবারতো সেরা ষোলর লড়াই। হারলেই বিদায়। এবারও যদি ব্রাজিল আর নরওয়ে খেলায় আমেরিকার রেফারি ইসমাইল ইলফাত কোন ভুল বাঁশি বাজান, তখন কি হবে ?

এআরবি/এসকেডি/এএসএম